গর্ভধারণের পঞ্চম সপ্তাহ

পঞ্চম সপ্তাহ নিয়ে আপনার যা জানা প্রয়োজন

এটি হল প্রথমবারের মত বন্ধ হওয়া পিরিয়ড বা মাসিকের সময়। অধিকাংশ নারী এসময়ই মাত্র বুঝতে শুরু করেন যে তিনি সম্ভবত গর্ভবতী। 

তবে অনেকের ক্ষেত্রে পিরিয়ড প্রতি মাসে নির্দিষ্ট সময়ে না হয়ে কিছুটা আগে বা পরে হয়। তাই তারা গর্ভধারণের ব্যাপারটি আরো দেরিতে বুঝতে পারেন। এছাড়া গর্ভের ভ্রূণটি গর্ভাশয়ের দেয়ালে বসতে গিয়ে মাসিকের রাস্তা দিয়ে কিছুটা রক্তপাতও হতে পারে (ইমপ্লান্টেশন ব্লিডিং); অনেকেই একে পিরিয়ডের বা মাসিকের রক্ত মনে করে ভুল বুঝতে পারেন। 

তবে এসময় পিরিয়ড বন্ধ থাকা ছাড়াও গর্ভবতী মায়ের শরীরে কিছু লক্ষণ দেখা দেয়, যা থেকে গর্ভধারণের বিষয়টি প্রাথমিকভাবে অনুমান করা যেতে পারে। 

সেই লক্ষণগুলো কী?

এমন ১১টি লক্ষণ হল:  

  • স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি ক্লান্ত অনুভব করা
  • স্তনে হালকা ব্যথা বা চাপ দিলে ব্যথা অনুভব করা
  • মুখে ধাতব স্বাদ (metallic taste) পাওয়া
  • বমি বমি ভাব (বিশেষ করে সকালের দিকে এমনটা হয়, তাই একে “মর্নিং সিকনেস” বলা হয়ে থাকে) 
  • মাথাব্যথা
  • মুড সুইং বা ঘন ঘন মনমেজাজ বদলানো
  • খাদ্যাভ্যাসে লক্ষণীয় পরিবর্তন আসা। হঠাৎ নতুন কোন খাবারে তীব্র রুচি বা প্রিয় কোন খাবারে অরুচি দেখা দেওয়া
  • ঘ্রাণশক্তি আগের চেয়ে তীব্র হওয়া
  • ছোটখাটো বিষয়ে মন খারাপ লাগা/কান্না করে ফেলার প্রবণতা দেখা দেওয়া। গর্ভাবস্থায় শরীরের হরমোনগুলোর ওঠানামার কারণে এসব লক্ষণ দেখা দেয়
  • সাদাস্রাবের পরিমাণ বেড়ে যাওয়া
  • পিরিয়ড বা মাসিকের ব্যথার মত তলপেটে মোচড় দিয়ে ব্যথা অনুভব করা, পেটে অস্বস্তি বা পেট ফাঁপা হয়েছে এমন মনে হওয়া 

প্রসবকালীন সেবা (একে গর্ভকালীন বা মাতৃত্বকালীন সেবাও বলা হয়)

আপনি গর্ভধারণ করেছেন এ বিষয়ে নিশ্চিত হওয়ার সাথে সাথেই আপনার পরিচিত ডাক্তারের সাথে বা কোন মেটারনিটি ক্লিনিকে বা নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যোগাযোগ করুন, যাতে আপনি সঠিক সময়ে গর্ভকালীন সেবা গ্রহণ শুরু করতে পারেন৷ যোগাযোগের পর ডাক্তার বা স্বাস্থ্যকর্মী আপনার প্রথম চেকআপ তথা চিকিৎসা এবং প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থা করবেন।

আপনার যদি এমন কোন স্বাস্থ্য সমস্যা থাকে যা আপনার গর্ভাবস্থার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে, যেমন হার্ট বা ফুসফুসের সমস্যা, খিঁচুনি রোগ, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা, হাই প্রেশার, থাইরয়েডের সমস্যা, ডায়াবেটিস, অ্যাজমা বা হাঁপানি, সেক্ষেত্রে যত দ্রুত সম্ভব আপনার গর্ভকালীন সেবা গ্রহণ শুরু করা জরুরি। 

গর্ভধারণের আগে থেকেই চালিয়ে যাচ্ছিলেন এমন কোন ওষুধ ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া সেবন করা বন্ধ করবেন না। 

যেসব বিষয়ে খেয়াল রাখতে হবে:

গর্ভধারণের আগে থেকেই চালিয়ে যাচ্ছিলেন এমন কোন ওষুধ ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া সেবন করা বন্ধ করবেন না। 

এছাড়া একটি স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলার চেষ্টা করুন। বেশি বেশি পুষ্টিকর খাবার খান, যাতে আপনার শরীর ও গর্ভের শিশু উভয়ই প্রয়োজনীয় পুষ্টি পায়।

গর্ভাবস্থায় বদহজম একটি কমন সমস্যা। বদহজম এড়াতে প্রতি বারে অল্প অল্প করে খান, এভাবে ঘন ঘন খেতে থাকুন এবং সেই সাথে প্রচুর পানি পান করুন।  

ফলিক এসিড আর ভিটামিন ডি ট্যাবলেট এর পাশাপাশি ভিটামিন সি-যুক্ত বা টক জাতীয় খাবার – যেমন লেবু, কমলালেবু, মাল্টা, আমড়া, পেয়ারা, আমলকী, আপেল ইত্যাদি খেতে থাকুন। ভিটামিন সি আপনার শিশুর বৃদ্ধি ও বিকাশে সহায়তা করবে৷

গর্ভের শিশু কীভাবে বড় হচ্ছে

এ পর্যায়ে গর্ভের শিশুর প্রধান অঙ্গগুলোর প্রাথমিক কাঠামো তৈরি হয়েছে এবং শিশুর স্নায়ুতন্ত্র (মস্তিষ্ক/ব্রেইনসহ বোধশক্তির সাথে সম্পর্কিত অন্যান্য অঙ্গ মিলে তৈরি হয়) ইতোমধ্যেই বিকশিত হচ্ছে। এই ধাপে ভ্রূনটি (ভ্রূণ পরিণত হয়ে ভবিষ্যতে আপনার পূর্ণাঙ্গ শিশুতে রূপ নেয়) প্রায় ২ মিলিমিটার দৈর্ঘ্যের হয়ে থাকে। 

হৃৎপিন্ড একটি সরল টিউব বা নলের মত কাঠামো হিসেবে তৈরি হতে থাকে। শিশুটির কিছু নিজস্ব রক্তনালী ইতোমধ্যেই তৈরি হয়ে যায় এবং রক্ত চলাচল শুরু হয়। সাধারণত এ সময়েই শিশুটির হৃৎপিন্ড প্রথমবারের মত স্পন্দিত হয়ে কাজ শুরু করে অর্থাৎ হার্টবিট শুরু হয়।  

এই রক্তনালীগুলোর একটি তারের মত অংশ শিশুটিকে মায়ের দেহের সাথে যুক্ত করে রাখে, যা পরবর্তীতে আম্বিলিকাল কর্ড (Umbilical cord) বা নাড়িতে পরিণত হবে। 

একই সময়ে ভ্রূণটির বাইরের স্তরের কোষগুলো একটি খাঁজ সৃষ্টি করে, যা আরও গভীরভাবে ভাঁজ হয়ে নিউরাল টিউব নামের একটি ফাঁপা নলের মত কাঠামোতে পরিণত হয়। এই নিউরাল টিউব থেকেই পরবর্তীতে শিশুটির মস্তিষ্ক ও মেরুদণ্ড তৈরি হবে। 

নিউরাল টিউবের এক প্রান্তের (শুরুর বা মাথার দিকের) ত্রুটি থেকে ‘অ্যানেনসেফালি’ (anencephaly) দেখা দিতে পারে, যেখানে মাথার খুলির হাড়গুলো সঠিকভাবে গড়ে ওঠে না। অন্য প্রান্তের (শেষের বা লেজের দিকের) ত্রুটি থেকে দেখা দিতে পারে ‘স্পাইনা বিফিডা’ (spina bifida) – এতে মেরুদণ্ড সঠিকভাবে তৈরি হয় না, মেরুদণ্ডে গ্যাপ বা শূন্যস্থান থেকে যায়।

ফলিক এসিড স্পাইনা বিফিডা প্রতিরোধে সহায়তা করে। তাই গর্ভধারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার সাথে সাথে আপনার ফলিক এসিড সেবন শুরু করা উচিত (এমনকি সম্ভব হলে গর্ভধারণের আগে থেকেও শুরু করা যেতে পারে)।