গর্ভধারণের চতুর্থ সপ্তাহ

চতুর্থ সপ্তাহে আপনার যা জানা প্রয়োজন

সাধারণত গর্ভধারণের সময়কাল হল আপনার সর্বশেষ মাসিক/মেন্স বা পিরিয়ডের দুই সপ্তাহ পরে, অর্থাৎ আপনার ডিম্বপাতের কাছাকাছি সময়ে। (গর্ভধারণে সক্ষম নারীদের ডিম্বাশয় থেকে প্রতিমাসে ডিম্বাণু বের হয়, একে ডিম্বপাত বলা হয়ে থাকে।)

গর্ভাবস্থার প্রথম ৪ সপ্তাহে আপনি হয়তো কোন লক্ষণই খেয়াল করবেন না।

নারীরা গর্ভধারণ করলে সবার আগে যেই বিষয়টি বুঝতে পারেন তা হল তাদের মাসিক বা পিরিয়ড বন্ধ হয়ে যাওয়া। এছাড়া গর্ভাবস্থার অন্যান্য লক্ষণ, যেমন চাপ দিলে স্তনে ব্যথা অনুভব করা (breast tenderness), এমন লক্ষণও থাকতে পারে। কারো কারো ক্ষেত্রে মাসিকের তারিখে যোনিপথ তথা মাসিকের রাস্তা থেকে হালকা বা ফোঁটা ফোঁটা রক্তপাতও হতে পারে – মাসিক নিয়ন্ত্রণকারী হরমোনগুলোর প্রভাবে এমনটা হয়ে থাকে। এতে সাধারণত ঘাবড়ানোর কোন কারণ নেই। গর্ভাবস্থায় এক বা একাধিকবার এমনটা হতে পারে৷

তবে যদি রক্তপাতের পরিমাণ বেশি হয় সেক্ষেত্রে অবশ্যই দেরি না করে ডাক্তারের শরণাপন্ন হতে হবে৷ 

অধিকাংশ নারীই প্রেগন্যান্সি টেস্টের মাধ্যমে গর্ভধারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হোন।

আপনার সর্বশেষ অর্থাৎ গত মাসিকের প্রথম/শুরুর দিন থেকে হিসাব করে আপনি আপনার সন্তান জন্মদানের সময় অর্থাৎ ডেলিভারির সম্ভাব্য তারিখ বের করতে পারেন, আবার আল্ট্রাসাউন্ড স্ক্যান করেও এটি জানা যায়। তবে এই দুই পদ্ধতিতে বের করা সময়সীমায় কিছুটা পার্থক্য থাকতে পারে।

কি কি বিষয় খেয়াল রাখতে হবে?

  • আপনি যদি ইতোমধ্যে ফলিক এসিড সেবন শুরু না করে থাকেন, তবে দেরি না করে এখনই শুরু করুন। দৈনিক ৪০০ মাইক্রোগ্রাম ফলিক এসিড ট্যাবলেট সেবন করুন আর ১২তম সপ্তাহ পর্যন্ত এটি সেবন করা চালিয়ে যান। ফলিক এসিড আপনার গর্ভের শিশুকে ‘স্পাইনা বিফিডা’ সহ অন্যান্য নিউরাল টিউবজনিত (মস্তিষ্ক/ব্রেইন, মেরুদণ্ড ও স্নায়ুর) সমস্যা থেকে রক্ষা করবে।
  • দৈনিক ১০ মাইক্রোগ্রাম করে ভিটামিন-ডি ট্যাবলেট সেবন করুন। ভিটামিন ডি শিশুর হাড় ও দাঁত গঠনে ভূমিকা রাখবে।  
  • যদি আপনার ডায়াবেটিস থাকে বা ওজন বেশি হয় ( বি এম আই ৩০ এর বেশি হলে), সেক্ষেত্রে ফলিক এসিড সেবনের মাত্রা বাড়ানোর প্রয়োজন হতে পারে। তবে ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া কোন ওষুধই বেশি মাত্রায় সেবন করা উচিৎ নয়৷

গর্ভের শিশু কীভাবে বড় হচ্ছে

গর্ভাবস্থার শুরুর দিকে, মূলত গর্ভের ৪র্থ ও ৫ম সপ্তাহে ভ্রূণটি জরায়ুর ভেতরের আবরণীতে বেড়ে উঠতে থাকে। এই ভ্রূণটিই ভবিষ্যতে আপনার পূর্ণাঙ্গ শিশুতে রূপ নেবে।

ভ্রূণের বাইরের দিকের কোষগুলো মায়ের রক্ত সরবরাহ ব্যবস্থার সাথে যোগাযোগ তৈরি করে। অন্যদিকে, ভ্রূণের ভেতরের দিকের কোষগুলো পর্যায়ক্রমে ২ থেকে ৩ স্তরে বিন্যস্ত হয় এবং প্রতিটি স্তর পরবর্তীতে শিশুর দেহের ভিন্ন ভিন্ন অংশে পরিণত হয়:

  • ভেতরের স্তরটি শ্বসনতন্ত্র (কাজ: শ্বাস-প্রশ্বাস সংক্রান্ত) ও পরিপাকতন্ত্রের (কাজ: হজম সংক্রান্ত) বিভিন্ন অংশে, যেমন ফুসফুস, পাকস্থলী, অন্ত্র ও মূত্রাশয়, ইত্যাদিতে পরিণত হয়।
  • মাঝের স্তরটি পরিণত হয় হৃৎপিণ্ড/হার্ট, রক্তনালি, মাংসপেশি ও হাড়ে। 
  • বাইরের স্তরটি থেকে তৈরি হয় মস্তিষ্ক বা ব্রেইন ও স্নায়ুতন্ত্র, চোখের লেন্স, দাঁতের এনামেল (দাঁতের বাইরের চকচকে আবরণ), ত্বক ও নখ।

গর্ভাবস্থার শুরুর দিকের এই সপ্তাহগুলোতে ভ্রূণটি একটি ছোট কুসুম থলির সাথে সংযুক্ত থাকে যা একে পুষ্টি সরবরাহ করে।

তবে এই ছোট কুসুম থলির পক্ষে গর্ভাবস্থার পুরো সময় জুড়ে ভ্রূণকে পুষ্টি সরবরাহ করা সম্ভব হয় না। এজন্য প্রয়োজন হয় প্লাসেন্টা বা অমরার, যা গর্ভফুল নামেও পরিচিত; এটি পরবর্তী কয়েক সপ্তাহ শেষে পুরোপুরি প্রস্তুত হয়ে গিয়ে ভ্রূণকে পুষ্টি সরবরাহ করার দায়িত্ব নেয়।

ভ্রুণটি অ্যামনিওটিক থলি নামের একটি থলির ভেতরে চারিদিকে তরল দিয়ে ঘেরা থাকে। এই থলির বাইরের স্তরটি থেকেই প্লাসেন্টা/অমরা তথা গর্ভফুল গঠিত হয়।

শুরুর দিকের এই সময়ে প্লাসেন্টার কোষগুলো জরায়ুর দেয়ালের গভীরে গিয়ে বড় হতে থাকে। এভাবেই একটি শক্তিশালী রক্ত সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে ওঠে, যার মাধ্যমে গর্ভের শিশুটির প্রয়োজনীয় অক্সিজেন ও পুষ্টি সরবরাহ নিশ্চিত হয়।