ওজন কত হওয়া উচিত

নিয়ন্ত্রিত ওজন মারাত্মক অনেক স্বাস্থ্য ঝুঁকি কমিয়ে দিতে পারে

শরীর সুস্থ রাখতে ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ওজন স্বাভাবিকের চেয়ে অতিরিক্ত বেড়ে গেলে শরীরের নিজস্ব ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায়। সেই সাথে নানান ধরনের রোগ হওয়ার ঝুঁকিও বেড়ে যায়। অন্যদিকে ওজন স্বাভাবিকের চেয়ে কম হলেও বিভিন্ন স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা দিতে পারে।

বিশেষ দ্রষ্টব্য

এই আর্টিকেলে উল্লেখ করা স্বাভাবিক সীমাগুলো প্রাপ্তবয়স্ক, অন্যথায় সুস্থ এবং গর্ভবতী নয় এমন নারী ও পুরুষের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।

ওজন কেন নিয়ন্ত্রণে রাখবেন

দেহের ওজন ও স্বাস্থ্যের মধ্যে গভীর সম্পর্ক রয়েছে। সুস্বাস্থ্য ও বিভিন্ন রোগের পরিবেষ্টিত জালের কেন্দ্রে রয়েছে শরীরের ওজন।

ওজন সম্পর্কিত যে বিষয়গুলো সুস্বাস্থ্যের সাথে নিবিড়ভাবে জড়িত তার মধ্যে রয়েছে—

  • দেহের উচ্চতা অনুযায়ী ব্যক্তির ওজন
  • কোমরের মাপ তথা পেটে মেদের পরিমাণ 
  • ২৫ বছর বয়সের পর থেকে ওজনের কেমন বাড়ছে

শরীরকে সুস্থ রাখতে ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ওজন স্বাভাবিকের চেয়ে অতিরিক্ত বেড়ে গেলে শরীরের নিজস্ব ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায়। সেই সাথে নানান ধরনের রোগ হওয়ার ঝুঁকিও বেড়ে যায়।

আবার ওজন স্বাভাবিকের চেয়ে কম হলেও শরীরে বিভিন্ন জটিলতা দেখা দিতে পারে। তাই সুস্বাস্থ্যের জন্য ধূমপানমুক্ত থাকার পাশাপাশি নিয়ন্ত্রিত ওজনের ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়।

অতিরিক্ত ওজন ও স্থূলতার নানান জটিলতা

অতিরিক্ত ওজন ও স্থূলতা এমন অবস্থাকে বুঝায় যখন শরীরে অস্বাভাবিক পরিমাণে মেদ-চর্বি জমে—যা স্বাস্থ্যকে হুমকির মুখে ঠেলে দিতে পারে।

১৯৭৫ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত—এই ৪০ বছরে বিশ্বব্যাপী স্থূলতার হার বেড়েছে প্রায় তিনগুণ। বৈশ্বিকভাবে বর্তমানে কম ওজনের তুলনায় অতিরিক্ত ওজন ও স্থূলতার সাথে সম্পর্কিত রোগে অধিক মৃত্যু ঘটে।

নিম্ন ও মধ্য আয়ের দেশে প্রাপ্তবয়স্কদের পাশাপাশি শিশুরাও অতিরিক্ত ওজন ও স্থূলতার ঝুঁকির সম্মুখীন হচ্ছে। এসব দেশে শিশুরা কম খরচে ক্যালরিবহুল খাবারের সংস্পর্শে আসছে। এগুলোতে উচ্চমাত্রায় ফ্যাট, চিনি, লবণ ও ক্যালরি থাকে—অথচ ভিটামিন ও মিনারেলসহ গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদান থাকে খুবই কম।

এই ধরনের খাদ্যাভ্যাসের পাশাপাশি শরীরচর্চার অভাব শিশু স্থূলতার হার আশংকাজনকভাবে বাড়িয়ে দিচ্ছে। অন্যদিকে অপুষ্টির সমস্যাও রয়েছে যাচ্ছে।

অতিরিক্ত ওজন ও স্থূলতা বিভিন্ন মারাত্মক রোগে আক্রান্ত হওয়া এবং কম বয়সে মৃত্যুবরণ করার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। আমাদের উপমহাদেশের মানুষদের ক্ষেত্রে বিএমআই সূচক যদি ২৩ অথবা তার বেশি হয় তাহলে সেটিকে অতিরিক্ত ওজন বা Overweight ধরা হয়। আর ফলাফল যদি ৩০ অথবা তার বেশি হয়, তখন সেটিকে স্থূল বা Obese বলা হয়। 

বিএমআই সূচক নিয়ে এই আর্টিকেলের পরবর্তী অংশে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।

অতিরিক্ত ওজন ও স্থূলতার পাশাপাশি পেটের বাড়তি মেদও বিভিন্ন মারাত্মক রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি—এমনকি ব্যক্তির মৃত্যুবরণ করার ঝুঁকিও বাড়িয়ে দেয়।

অতিরিক্ত ওজন ও স্থূলতা থেকে সৃষ্ট মারাত্মক স্বাস্থ্য সমস্যাগুলোর মধ্যে রয়েছে—

শুধুমাত্র মেদ-চর্বি কমিয়ে অতিরিক্ত ওজন একটি সুস্থ মাত্রায় নিয়ে আসার মাধ্যমে এসব মারাত্মক স্বাস্থ্য জটিলতার ঝুঁকি অনেকাংশেই কমিয়ে আনা যায়।

ওজন কম হওয়ার জটিলতা

ওজন স্বাভাবিকের চেয়ে কম হওয়ার পেছনে যথেষ্ট পরিমাণ খাবার না খাওয়া, অপুষ্টিতে ভোগা অথবা কোনো রোগে আক্রান্ত হওয়া দায়ী হতে পারে। অস্বাভাবিকভাবে কম ওজন হলে বিভিন্ন স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা দেয়। যার মধ্যে রয়েছে—

  • পুষ্টিহীনতা
  • রক্তশূন্যতা
  • রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়া
  • হাড় ভঙ্গুর হয়ে যাওয়া ও অস্টিওপোরোসিস
  • মাসিক ও গর্ভধারণে সমস্যা হওয়া

গুরুত্বপূর্ণ তথ্য

একজন সুস্থ ও নীরোগ মানুষ স্বভাবতই কম ওজনের অধিকারী হতে পারেন। তিনি যদি স্বাস্থ্যকর খাবারের অভ্যাস মেনে চলেন এবং নিয়মিত শরীরচর্চা করেন, তাহলে ওজন স্বাভাবিকের চেয়ে কিছুটা কম হলেও সাধারণত ওজন বাড়ানোর প্রয়োজন হয় না।

উচ্চতা অনুযায়ী স্বাভাবিক ওজন কত হওয়া উচিত?

সুস্থ জীবনধারার জন্য ওজন স্বাভাবিক সীমার মধ্যে থাকা জরুরি। আর একারণে আপনার জন্য আদর্শ ওজন কত সেটি জেনে রাখাও প্রয়োজন। এর মাধ্যমে আপনি অতিরিক্ত ওজন কমিয়ে ফেলতে পারবেন। আবার ওজন কম হলে সেই বিষয়েও ব্যবস্থা নিতে পারবেন।

একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষের স্বাভাবিক ওজন কত হওয়া উচিত তা হিসাব করার বিভিন্ন উপায় রয়েছে। এমন একটি আন্তর্জাতিক সূচক হলো বডি ম্যাস ইনডেক্স (বিএমআই)। এর সাহায্যে উচ্চতা অনুযায়ী প্রত্যেকের আদর্শ ওজন নির্ণয় করা যায়। বিএমআই ছাড়াও সঠিক ওজন নির্ণয়ের অন্যান্য উপায়গুলোর মধ্যে রয়েছে—ডেভিন ফর্মুলা ও হাম্যুয়ি মেথড।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, বাংলাদেশিসহ এশিয় বংশোদ্ভূত নারী-পুরুষের বিএমআই যদি ২৩ অথবা তার বেশি হয়, তাহলে বিভিন্ন জটিল ও দীর্ঘমেয়াদি রোগে (যেমন: ডায়াবেটিসে) আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়।

এই অনুযায়ী উল্লিখিত জনগোষ্ঠীর ওজন কোন উচ্চতায় কত হওয়া উচিত—সেটি নিচের তালিকায় তুলে ধরা হয়েছে। তালিকার শেষে বিএমআই কী এবং সুস্বাস্থ্যের জন্য স্বাভাবিক বিএমআই-এর গুরুত্ব নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা হয়েছে।

আমাদের দেশে উচ্চতা ফুট-ইঞ্চি এককে হিসাব করার প্রচলন বেশি। এজন্য চার্টের বামদিকে উচ্চতা তুলে ধরার ক্ষেত্রে এসব একক ব্যবহার করা হয়েছে এবং চার্টের ডানদিকে আদর্শ ওজন কেজিতে দেখানো হয়েছে।

উচ্চতাওজন সীমা
৪ ফিট ২ ইঞ্চি২৯.৮ – ৩৭ কেজি
৪ ফিট ৩ ইঞ্চি৩১.৩ – ৩৮.৮ কেজি
৪ ফিট ৪ ইঞ্চি৩২.২ – ৪০ কেজি
৪ ফিট ৫ ইঞ্চি৩৩.৭ – ৪১.৯ কেজি
৪ ফিট ৬ ইঞ্চি৩৪.৭ – ৪৩.১ কেজি
৪ ফিট ৭ ইঞ্চি৩৬.৩ – ৪৫ কেজি
৪ ফিট ৮ ইঞ্চি৩৭.৩ – ৪৬.৩ কেজি
৪ ফিট ৯ ইঞ্চি৩৯ – ৪৮.৩ কেজি
৪ ফিট ১০ ইঞ্চি৪০ – ৪৯.৭ কেজি
৪ ফিট ১১ ইঞ্চি৪১.৬ – ৫১.৭ কেজি
৫ ফিট৪২.৭ – ৫৩.১ কেজি
৫ ফিট ১ ইঞ্চি৪৪.৪ – ৫৫.২ কেজি
৫ ফিট ২ ইঞ্চি৪৫.৬ – ৫৬.৬ কেজি
৫ ফিট ৩ ইঞ্চি৪৭.৪ – ৫৮.৮ কেজি
৫ ফিট ৪ ইঞ্চি৪৯.২ – ৬১.১ কেজি
৫ ফিট ৫ ইঞ্চি৫০.৪ – ৬২.৬ কেজি
৫ ফিট ৬ ইঞ্চি৫২.২ – ৬৫ কেজি
৫ ফিট ৭ ইঞ্চি৫৩.৫ – ৬৬.৪ কেজি
৫ ফিট ৮ ইঞ্চি৫৫.৪ – ৬৮.৮ কেজি
৫ ফিট ৯ ইঞ্চি৫৬.৭ – ৭০.৪ কেজি
৫ ফিট ১০ ইঞ্চি৫৮.৬ – ৭৩ কেজি
৫ ফুট ১১ ইঞ্চি৬০ – ৭৪.৫ কেজি
৬ ফুট৬২ – ৭৭ কেজি
৬ ফুট ১ ইঞ্চি৬৩.৩ – ৭৮.৭ কেজি
৬ ফুট ২ ইঞ্চি৬৫.৪ – ৮১.৩ কেজি
উচ্চতা অনুযায়ী আদর্শ ওজন

বিএমআই কী?

বিএমআই এর পূর্ণরূপ হলো ‘বডি ম্যাস ইনডেক্স’। এটি একটি আন্তর্জাতিক সূচক—যার মাধ্যমে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষের ওজন কম, স্বাভাবিক না কি বাড়তি—সেটি নির্ণয় করা হয়।

বিএমআই বের করার নিয়ম

একজন ছেলে অথবা মেয়ের ওজন ও উচ্চতা ব্যবহার করে বিএমআই বের করা হয়। ওজন মাপা হয় কেজিতে এবং উচ্চতা মাপা হয় মিটারে। মোট ওজনকে উচ্চতার বর্গফল দিয়ে ভাগ করে বিএমআই নির্ণয় করা হয়। অর্থাৎ, বিএমআই নির্ণয়ের সূত্রটি হচ্ছে—

বিএমআই হিসাব বের করার পদ্ধতি

বৈশ্বিক হিসাব

আন্তর্জাতিকভাবে বিএমআই ১৮.৫ থেকে ২৪.৯ এর মধ্যে হলে উচ্চতা অনুযায়ী ওজন সঠিক ধরে নেওয়া হয়।

বিএমআইফলাফল
১৮.৫ এর নিচেআন্ডারওয়েট বা অস্বাভাবিক কম ওজন
১৮.৫ থেকে ২৪.৯স্বাভাবিক ওজন
২৫.০ থেকে ২৯.৯অতিরিক্ত ওজন
৩০ অথবা তার বেশিস্থূল বা Obese

এই হিসাবটি গড়ে বিশ্বের সব দেশের সব জাতির মানুষের জন্য তৈরি করা হয়েছে। তবে এশিয়, কৃষ্ণাঙ্গ ও কিছু সংখ্যালঘু নৃগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে স্বাভাবিক বিএমআই কিছুটা ভিন্ন।

ভারতীয় উপমহাদেশের নারী-পুরুষদের ক্ষেত্রে হিসাব

বাংলাদেশিদের বিএমআই ২৩ অথবা তার বেশি হলে বিভিন্ন রোগ (যেমন: ডায়াবেটিস) হওয়ার ঝুঁকি বেশি। এছাড়াও বিএমআই ২৩ এর বেশি হলে ভারতীয়, এশিয় ও কৃষ্ণাঙ্গসহ কিছু সংখ্যালঘু নৃগোষ্ঠীর টাইপ ২ ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, হাই প্রেসার সহ বিভিন্ন দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্য জটিলতায় ভোগার ঝুঁকি বেড়ে যায়।

  •  বিএমআই ২৩ অথবা তার বেশি হলে এসব রোগের ঝুঁকি বেড়ে যায়
  •  বিএমআই ২৭.৫ অথবা তার বেশি হলে এসব স্বাস্থ্য জটিলতা সৃষ্টি হওয়ার উচ্চ ঝুঁকি থাকে

বিএমআই যত বাড়ে, মারাত্মক বিভিন্ন রোগের ঝুঁকিও ততই বাড়তে থাকে। তাই এসব ঝুঁকি এড়াতে বিএমআই ২৩ এর নিচে রাখার ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। এজন্য প্রয়োজন স্বাস্থ্যকর খাবারের অভ্যাস এবং শারীরিক পরিশ্রম

মনে রাখা প্রয়োজন

কারো বর্তমান বিএমআই স্বাভাবিক সীমার মধ্যে থাকলেও যদি ওজন ও মেদ ক্রমশ বাড়তে থাকে, তাহলে হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, পিত্তথলির পাথর ও টাইপ ২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকিও তাল মিলিয়ে বাড়ে।

হতে পারে আপনার ওজন এমন পর্যায়ে আছে যে, আরও কয়েক কেজি ওজন বাড়লেও তা স্বাভাবিক বিএমআই সীমার মধ্যেই থাকবে। এক্ষেত্রে আপনার করণীয় হলো বর্তমান ওজন ধরে রাখা। ওজন বাড়ানোর অবকাশ থাকলেই ওজন বাড়ানো যাবে—এমন ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।

বিএমআই এর পাশাপাশি যেসব বিষয় খেয়াল রাখবেন

বিএমআই অতিরিক্ত ওজন নির্ধারণে কার্যকর হলেও সূচকটির কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো—বিএমআই এর সাহায্যে শরীরের মেদ (বডি ফ্যাট) বা চর্বির পরিমাণ হিসাব করা সম্ভব নয়।

তাছাড়া সূচকটির মাধ্যমে কেবল ওজন স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি কি না সেটা জানা যায়। অতিরিক্ত ওজনের পেছনের কারণ কী—অতিরিক্ত মেদ, মাংসপেশি না কি হাড়ের ওজন—সে বিষয়ে পার্থক্য করা যায় না। তাছাড়া বিএমআই গণনায় বয়স ও লিঙ্গও বিবেচনায় নেওয়া হয় না।

ফলে—

  • শরীরে মেদের পরিমাণ কম হওয়ার পরেও পেশিবহুল কাউকে ‘অতিরিক্ত ওজন’ বা ‘স্থূল’ দলভুক্ত করা হতে পারে।
  • বয়স বাড়ার সাথে সাথে শরীরের মাংসপেশি কমে গেলেও এমন ব্যক্তিদের ওজন ‘স্বাভাবিক’ ধরা হয়, যদিও তারা অতিরিক্ত মেদভুঁড়ির অধিকারী হতে পারেন।
  • গর্ভধারণের কারণে ওজন বাড়ার ফলেও বিএমআই বেড়ে যায়। তাই সঠিক ফলাফল পেতে গর্ভবতী হওয়ার পূর্বের ওজন ব্যবহার করে বিএমআই হিসাব করা উচিত।

তবে এসব সীমাবদ্ধতা থাকার পরেও তুলনামূলক সহজবোধ্য ও সুবিধাজনক একটি পদ্ধতি হিসেবে বিএমআই এর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।

দীর্ঘমেয়াদি রোগের ঝুঁকির বিষয়ে সতর্ক থাকতে বিএমআই ছাড়াও অন্যান্য কিছু বিষয়ে ধারণা থাকা প্রয়োজন। নিচে এমন ৩টি বিষয় তুলে ধরা হলো—

১. পেটের মেদ নিয়ে সতর্ক থাকুন

বাড়তি ওজনের পাশাপাশি পেটের মেদও স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। অতিরিক্ত ভুঁড়ি থাকলে হৃদরোগ, টাইপ ২ ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, উচ্চ কোলেস্টেরল ও ব্রেইন স্ট্রোকের মতো মারাত্মক রোগের ঝুঁকি বেড়ে যায়।

কয়েক বছরের মধ্যে পেটের মেদ ২-৩ ইঞ্চি বেড়ে গেলে সেটাও শঙ্কার কারণ হতে পারে। এক্ষেত্রে আপনার দৈনন্দিন খাবারের অভ্যাস ও শারীরিক পরিশ্রম নিয়ে নতুন করে ভাবা উচিত।

অতিরিক্ত মেদ কেন ক্ষতিকর

গবেষণায় দেখা গেছে, শরীরে অতিরিক্ত মেদ হলে সেটি সাধারণত পেটের মাঝের অংশে (নাভির চারিদিকে) জমা হওয়ার প্রবণতা থাকে। শরীরের অন্যান্য স্থানের মেদের তুলনায় পেটের মধ্যে জমা হওয়া চর্বি বা মেদ থেকে বিভিন্ন হরমোন ও কেমিক্যাল তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। এসব হরমোন ও কেমিক্যাল আমাদের স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলে।

https://www.youtube.com/watch?v=jsl8Gx9CUfU

ওজন ও বিএমআই স্বাভাবিক মাত্রায় থাকলেও কেবল পেটের অতিরিক্ত মেদের কারণে বিভিন্ন মারাত্মক রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

সাড়ে ৬ লক্ষ নারী-পুরুষের ওপর বিএমআই ও পেটের মেদের সম্পর্ক নিয়ে একটি গবেষণায় করা হয়। সেখানে দেখা যায়, একই বিএমআই এর দুজন ব্যক্তির মধ্যে যার পেটের মেদ বেশি তার অকাল মৃত্যু হওয়ার সম্ভাবনাও বেশি।

কোমরের মাপ কীভাবে নিতে হয়

এই মাপ নেওয়ার পদ্ধতিটি জামাকাপড় তৈরির সময়ে কোমরের মাপ যেভাবে নেওয়া হয় তা হতে আলাদা। নিচের পদ্ধতিতে আপনি সঠিকভাবে পেটের মাপ নির্ধারণ করতে পারেন। এজন্য একটি মেজারিং টেপ বা মাপ নেওয়ার ফিতা ব্যবহার করতে হবে।

নিচের তিনটি ধাপ অনুসরণ করে আপনি সহজেই কোমরের মাপ বের করতে পারবেন—

১. কোমরের দুই দিকে আলতো করে চাপ দিয়ে আপনার হিপ বোন বা কোমরের হাড়ের সবচেয়ে উঁচু পয়েন্ট খুঁজে বের করুন।

২. এবার বড় করে একটি শ্বাস নিয়ে নিঃশ্বাসটি স্বাভাবিকভাবে ছেড়ে দিন।

৩. এই অবস্থায় বের করা পয়েন্টের ঠিক উপর বরাবর মেজারিং টেপ দিয়ে কোমরে ফিতা পেঁচিয়ে মাপ নিন।

বেশিরভাগ মানুষের ক্ষেত্রে কোমরের হাড়ের সবচেয়ে উঁচু পয়েন্টটি নাভি বরাবর থাকে। কারও কারও ক্ষেত্রে পয়েন্টটি আরেকটু নিচে থাকতে পারে। সেক্ষেত্রে মাপ নেওয়ার সময়ে ফিতাটি নাভির আরেকটু নিচে নামিয়ে কোমরের হাড়ের ঠিক ওপরে ধরতে হয়।

ফিতা ধরার সময়ে দুটি বিষয়ে খেয়াল রাখতে হবে—

  • বেশি আঁটসাঁট অথবা ঢিলেঢালা না হয়
  • ফিতা যাতে মেঝের সমান্তরালে থাকে

কোমরের মাপ কত হওয়া উচিত

আপনার উচ্চতা, ওজন অথবা বিএমআই যতই হোক, পেটে অতিরিক্ত মেদ থাকলে তা সঠিক খাবার তালিকা ও নিয়মিত ব্যায়ামের মাধ্যমে কমিয়ে ফেলতে হবে।

কমিয়ে ফেলা ওজন ও পেটের মেদ যেন ফিরে না আসে সে উদ্দেশ্যে একটি সুস্থ জীবনধারা মেনে চলা উচিত। হার্ট অ্যাটাক, ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি কমাতে কোমরের মাপ কত হওয়া উচিত তা এখানে তুলে ধরা হয়েছে।

নারীদের ক্ষেত্রে৩১.৫ ইঞ্চি বা ৮০ সেন্টিমিটারের নিচে
পুরুষদের ক্ষেত্রে৩৭ ইঞ্চি বা ৯৪ সেন্টিমিটারের নিচে

পেটের মাপ এই সীমা অতিক্রম করলে ওজন ও মেদভুঁড়ি কমিয়ে ফেলার ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

এ ছাড়া এই মাপ যদি নারীদের ক্ষেত্রে ৩৪ ইঞ্চি (৮৮ সেমি) এবং পুরুষদের ক্ষেত্রে ৪০ ইঞ্চি (১০২ সেমি) অথবা এর চেয়েও বেশি হয়, তাহলে স্বাস্থ্যঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়। এক্ষেত্রে দ্রুত ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে।

২. কোমর ও নিতম্বের অনুপাত

কোমর ও নিতম্বের অনুপাত ইংরেজিতে ওয়েস্ট টু হিপ রেশিও (Waist-to-Hip Ratio) হিসেবে পরিচিত। পেট বা কোমরের মাপকে নিতম্বের মাপ দিয়ে ভাগ করে এই অনুপাত হিসাব করা হয়। বিভিন্ন দীর্ঘমেয়াদি রোগের ঝুঁকি সম্বন্ধে ধারণা পেতে অনুপাতটি বেশ কার্যকর।

পুরুষদের ক্ষেত্রে এই অনুপাত ০.৯০ এর বেশি এবং নারীদের ক্ষেত্রে অনুপাতটি ০.৮৫ এর বেশি হওয়া অনুচিত। অনুপাতটি এই সীমার উপরে যাওয়া বিভিন্ন ধরনের স্বাস্থ্য সমস্যা হওয়ার ঝুঁকি নির্দেশ করে।

কোমর ও নিতম্বের অনুপাত নির্ণয় করার পদ্ধতি তেমন কঠিন নয়—

১. প্রথমে উপরের পদ্ধতিতে কোমরের মাপ বের করুন

২. এবার নিতম্বের সবচেয়ে চওড়া জায়গা বরাবর টেপ পেঁচিয়ে মাপ নিন

৩. এই মাপ দিয়ে কোমরের মাপকে ভাগ করুন

তবে আপনার কাছে যদি হিসাবটি জটিল মনে হয়, তাহলে কেবল কোমরের মাপ ব্যবহার করেই কার্যকরভাবে বিভিন্ন দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি নির্ণয় করা যাবে।

৩. বডি ফ্যাট পারসেন্টেজ

এটি দ্বারা শরীরের মোট চর্বির শতকরা পরিমাণ জানা যায়। সেই সাথে কিছু কিছু পদ্ধতির মাধ্যমে শরীরের কোন অংশে কতটুকু মেদ আছে সেটিও বের করা যায়।

‘কোমরের মাপ’ ও ‘কোমর ও নিতম্বের অনুপাত’ এই পরিমাপের অন্তর্ভুক্ত। এ ছাড়াও যেসব উপায়ে শরীরে মেদের পরিমাণ (বডি ফ্যাট) হিসাব করা যায় তার মধ্যে রয়েছে—

স্লাইড ক্যালিপার্স

এই পদ্ধতিতে সহজ ও কম খরচে শরীরের নির্দিষ্ট কিছু অংশের মেদ পরিমাপ করা যায়। তবে এই পদ্ধতি শরীরের মোট মেদের অনুপাত নির্ণয়ের থেকেও একটি নির্দিষ্ট সময় ধরে শরীরের বিভিন্ন জায়গায় কী পরিমাণ মেদ আছে—তা পর্যবেক্ষণ করতে অধিক কার্যকর। তাছাড়া পদ্ধতিটি ব্যক্তিনির্ভর। যেমন: স্থূল ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এটি তেমন কার্যকর নয়।

বায়ো ইম্পিডেন্স

এই পদ্ধতিতে সহজেই খুব দ্রুত শতকরা মেদের পরিমাণ নির্ণয় করা যায় এবং সাধারণত বেশ সঠিক ফলাফল পাওয়া যায়। 

ডেক্সা স্ক্যান

ডেক্সা (DEXA) স্ক্যানকে শরীরের মেদসহ বিভিন্ন গাঠনিক উপাদানের অনুপাত নির্ণয়ের ‘গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড’ ধরা হয়। পদ্ধতিটি এক্স-রের মাধ্যমে মেদের অনুপাত, হাড়ের ঘনত্ব ও মেদমুক্ত টিস্যুর (Lean Body Mass) অনুপাত হিসাব করে।

DEXA স্ক্যানের মাধ্যমে দ্রুত ও নিরাপদ উপায়ে সঠিক ও নির্ভরযোগ্য হিসাব পাওয়া যায়। এই পদ্ধতিতে আপনি শরীরে মোট মেদের অনুপাতের পাশাপাশি কোন স্থানে কী পরিমাণ মেদ জমে আছে সেটাও জানতে পারবেন।

তবে এই পদ্ধতিটি ব্যয়বহুল। একটি স্ক্যান করাতে ১২ হাজার টাকা অথবা এর চেয়েও বেশি খরচ হতে পারে।

ওজন কমানোর কার্যকর উপায়

খাবার থেকে আমাদের দেহে জমা হওয়া শক্তি বা ক্যালরির পরিমাণ যখন প্রতিদিন খরচ হওয়া শক্তির চেয়ে বেশি হয় তখনই ওজন বাড়ে। ফলে অতিরিক্ত ওজন ও স্থূলতার মতো স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা দেয়। তাই ওজন কমাতে প্রয়োজন একটি সুস্থ জীবনধারা।

https://www.youtube.com/watch?v=ieme9Kv2poQ

নিজে নিজেই কিছু পরিবর্তন এনে একটি সুস্থ জীবনধারা চর্চা করা সম্ভব।

এজন্য একদিকে স্বাস্থ্যকর খাবারের অভ্যাস মেনে চলতে হবে, অন্যদিকে নিয়মিত শরীরচর্চা করতে হবে। খাবারের তালিকা থেকে ফ্যাট ও চিনিযুক্ত ক্যালরিবহুল খাবারের পরিমাণ কমিয়ে দিতে হবে। বেশি বেশি ফলমূল, শাকসবজি, ডাল, পূর্ণশস্য (যেমন: লাল চাল ও লাল আটা) ও বাদামজাতীয় খাবার ডায়েটে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

দৈনন্দিন অভ্যাসে ছোটো ছোটো কিছু পরিবর্তন এনেও ওজন কমানোর প্রচেষ্টা সহজ করা যায়। ওজন কমানোর জন্য সকালের ৮টি কার্যকর অভ্যাস আর্টিকেলে এরূপ কয়েকটি বিষয় আলোচনা করা হয়েছে।

বাসার বাইরে অথবা কর্মস্থলে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস ধরে রাখার কিছু পরামর্শ জানা যাবে কর্মস্থলে ক্যালোরি নিয়ন্ত্রণ আর্টিকেলে।

অতিরিক্ত ওজনের পাশাপাশি পেটের অতিরিক্ত মেদভুঁড়ি কমিয়ে ফেলাও জরুরি। পেটের মেদ কমানোর উপায় জানতে আমাদের আর্টিকেলটি পড়ুন।

এসবের পাশাপাশি শরীরচর্চা করতে হবে। ব্যায়াম বা শরীরচর্চার জন্য জিমে যেতেই হবে তা নয়। শরীরচর্চা হিসেবে সপ্তাহে কেবল পাঁচ দিন আধা ঘণ্টা করে দ্রুত হাঁটাও যথেষ্ট। এ ছাড়া পছন্দের যেকোনো ব্যায়াম বেছে নিতে পারেন।

নতুন করে যারা ব্যায়াম শুরু করতে চান, তারা ৯ সপ্তাহে দৌড়ানোর গাইডটি দেখে নিতে পারেন।

সহজ ও কার্যকর উপায়ে ওজন কমানোর জন্য আমাদের ১২ সপ্তাহে ওজন কমানোর প্ল্যানটি অনুসরণ করতে পারেন।

ওজন বাড়ানোর উপায়

ওজন বাড়ানোর চেষ্টা করার আগে কী কারণে ওজন স্বাভাবিকের চেয়ে কম তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। আমাদের ওজন বাড়ানোর উপায় আর্টিকেলে ওজন কমার বিভিন্ন কারণ তুলে ধরা হয়েছে। পাশাপাশি ওজন বাড়ানোর ডায়েট চার্ট ও ব্যায়াম সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।

https://www.youtube.com/watch?v=hUHCadgWZO8