মচকে যাওয়া ও মাংসপেশিতে টান পড়া

খেলাধুলার সময় অথবা ব্যায়াম করতে গিয়ে অসাবধানতাবশত আমাদের মাংসপেশিতে টান পড়তে পারে। কখনো কখনো কোথাও মচকে যেতে পারে। সমস্যা তেমন গুরুতর না হলে ঘরে বসেই আমরা এসবের চিকিৎসা করতে পারি। তবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে অতি দ্রুত ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়ার প্রয়োজন পড়তে পারে।

মচকে যাওয়া ও টান পড়ার মধ্যে পার্থক্য

টান পড়া: শরীরের কোনো মাংসপেশি সঠিক ভঙ্গিমায় নড়াচড়া না করলে অথবা অনেকক্ষণ ব্যবহার করা হলে, সেটিতে টান পড়তে পারে। একে মাংসপেশির টান বা স্ট্রেইন বলা হয়।

সাধারণত হাঁটু, পা ও পিঠের মাংসপেশিতে টান পড়ে থাকে।

মচকে যাওয়া: লিগামেন্ট শরীরের বিভিন্ন হাড় ও জয়েন্টের (গিরার) মধ্যে সংযোগ স্থাপন করতে সাহায্য করে। অতিরিক্ত নড়াচড়া হলে অথবা টান পড়লে লিগামেন্টের কিছু অংশ পেঁচিয়ে যায় অথবা ছিঁড়ে যায়। একে মচকে যাওয়া বা স্প্রেইন বলে।

হাত থেকে শুরু করে শরীরের যেকোনো জয়েন্টই মচকাতে পারে। যেমন: গোড়ালি, কব্জি, হাঁটু, বুড়ো আঙ্গুল।

মচকে যাওয়া ও পেশিতে টান পড়ার উপসর্গ

মচকে গেলে অথবা মাংসপেশিতে টান পড়লে সাধারণত—

  • আঘাতপ্রাপ্ত স্থানে প্রচণ্ড ব্যথা হয়। কখনো কখনো নীল হয়ে যেতে পারে। আবার কখনো কখনো স্থানটি লাল হয়ে ফুলে যেতে পারে।
  • আঘাতপ্রাপ্ত স্থানে (যেমন: পায়ে) স্বাভাবিক ভার দিতে কষ্ট হয়। টান পড়া বা মচকে যাওয়া স্থানের আশেপাশের অংশ দুর্বল লাগতে পারে।
  • মাংসপেশি ব্যথা করে এবং অস্বাভাবিকভাবে শক্ত হয়ে যায়।

সাধারণ মোচড় অথবা টান পড়ার ক্ষেত্রে দুই সপ্তাহের মধ্যেই অবস্থার উন্নতি দেখা যায়। তবে আক্রান্ত হওয়ার আট সপ্তাহের মধ্যে ভারী ব্যায়াম এড়িয়ে চলা উচিত। কারণ এতে আক্রান্ত স্থানে চাপ পড়ে, ক্ষতির মাত্রা বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।

গুরুতর মোচড় অথবা পেশির টান পড়ার ক্ষেত্রে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসতে কয়েক মাস পর্যন্ত সময় লেগে যেতে পারে।

দ্রুত হাসপাতালের জরুরী বিভাগে যান যদি—

  • আঘাত পাওয়ার সময় আপনি কোন ফাটলের শব্দ শুনেন
  • আঘাত পাওয়া অংশের স্বাভাবিক আকারে পরিবর্তন দেখা যায় অথবা তা বেঁকে যায়
  • আঘাতপ্রাপ্ত স্থানটি অসার, বিবর্ণ অথবা ঠান্ডা হয়ে যায় 

হাড় ভেঙে গেলে এসব লক্ষণ দেখা দিতে পারে।

প্রাথমিক চিকিৎসা

যদি সমস্যা তেমন গুরুতর মনে না হয়, তবে আপনি ঘরে বসেই প্রাথমিক চিকিৎসা নিতে পারেন। এ ক্ষেত্রে নিচের ৪টি পরামর্শ মেনে চলতে পারেন—

১. বিশ্রাম নিন: আঘাতপ্রাপ্ত অঙ্গকে বিশ্রাম দিন। প্রথম দুই থেকে চার দিনের জন্য সব ধরনের শারীরিক ব্যায়াম বন্ধ রাখুন। আঘাতপ্রাপ্ত স্থানে ভার দেওয়া থেকে বিরত থাকুন।

তবে অতিরিক্ত বিশ্রাম নেবেন না, কারণ এতে জয়েন্ট অথবা পেশি শক্ত হয়ে যেতে পারে।

যখন থেকে আপনি ক্ষতস্থানটি স্বাভাবিকভাবে নড়াচড়া করতে পারবেন অথবা ব্যথা কমে যাবে, তখন থেকে আপনি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক কাজ করার চেষ্টা করুন। দরকার হলে সাপোর্ট নিয়ে হাঁটা চলা অথবা আঘাতপ্রাপ্ত অঙ্গে মৃদু চাপ দিয়ে নড়া চড়া করা উচিত।

২. বরফের সেঁক দিন: ফোলা ভাব কমাতে বরফ বেশ উপকারী। তবে আঘাতপ্রাপ্ত স্থানে বরফ সরাসরি না দিয়ে আইস প্যাক (বরফের ব্যাগ) বা একটি পরিষ্কার কাপড়ে কিংবা তোয়ালেতে বরফ পেঁচিয়ে সেটা দিয়ে আঘাতের স্থানে সেঁক দিন। আঘাতের স্থানে দুই থেকে তিন ঘণ্টা পর পর ২০ মিনিটের জন্য বরফের ব্যাগ দিয়ে রাখুন।

৩. ব্যান্ডেজ বা ব্রেস পেঁচিয়ে রাখুন: আঘাতপ্রাপ্ত স্থানের যন্ত্রণা উপশমে ব্রেস অথবা ব্যান্ডেজ কাজে দিতে পারে । এটি আঘাতপ্রাপ্ত স্থানটির নড়াচড়া নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করবে। তবে অতিরিক্ত টাইট করে ব্রেস লাগাবেন না।

ব্রেস হলো এক ধরনের বন্ধনী যা শরীরের কোনো দুর্বল অংশকে পেঁচিয়ে রাখতে ব্যবহার করা হয় যাতে অংশটি সাপোর্ট পায় এবং নড়াচড়া কম হয়। অনেকসময় ডাক্তারের পরামর্শে ব্যান্ডেজ পেঁচিয়েও একই কাজ করা হয়।

৪. আঘাতপ্রাপ্ত অংশ উঁচুতে রাখা: আঘাতপ্রাপ্ত অংশ যত নামিয়ে বা নিচে ঝুলিয়ে রাখবেন ততো ফোলা বাড়বে। তাই আঘাতপ্রাপ্ত স্থানটি যতটা সম্ভব উপরে উঠিয়ে রাখতে হবে। এক্ষেত্রে বালিশ ব্যবহার করা যেতে পারে। এতে ফোলা ভাব দ্রুত কমে আসবে।

এ ছাড়াও ব্যথা কমানোর জন্য প্যারাসিটামল জাতীয় ব্যথানাশক ঔষধ সেবন করতে পারেন। ব্যথানাশক জেল ও ক্রিমও ব্যবহার করতে পারেন।

তবে ঔষধ খাওয়ার আগে তা আপনার জন্য নিরাপদ কি না অবশ্যই জেনে নিন। আপনি যদি নিশ্চিত না হোন, তবে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

যা করা যাবে না

  • আঘাতপ্রাপ্ত স্থানে প্রথম কয়েকদিন গরম সেঁক অথবা গরম পানি দেওয়া ঠিক না। এতে ফোলা আরও বেড়ে যেতে পারে।
  • এ ছাড়া আঘাতের স্থানে কোনো অবস্থাতেই মালিশ কিংবা ম্যাসাজ করা যাবে না। এটিও ফোলা ভাব বাড়িয়ে দিতে পারে
  • কঠোর ব্যায়াম এড়িয়ে চলতে হবে। পেশির কোনো অংশ টান করতে গিয়ে যদি ব্যথা অনুভব করেন তাহলে সেটি করা এড়িয়ে চলুন। এতে সমস্যা বাড়ার সম্ভাবনা থাকে।

এসব রোগের ক্ষেত্রে প্রাথমিক চিকিৎসার পর পরই পুনর্বাসনের ভূমিকা অপরিসীম। বিশেষ করে ক্রীড়াবিদদের বারবার একই স্থানে আঘাতের কারণে যাতে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতি না তৈরি হয় সেজন্যে পুনর্বাসন খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

মচকে যাওয়া ও পেশির টানের জন্য সাধারণত অপারেশনের দরকার হয় না। তবে যদি প্রাথমিক চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের পরও সমস্যা থেকে যায় সেক্ষেত্রে অপারেশনের দরকার হতে পারে।

কখন ডাক্তারের কাছে যাবেন?

নিচের কোনোটি দেখা দিলে দ্রুত ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে—

  • ঘরোয়া চিকিৎসার পরেও অবস্থার কোনো উন্নতি দেখা না দিলে
  • ফোলা না কমলে অথবা বাড়লে
  • শরীর ভীষণ দুর্বল হয়ে গেলে
  • অতিরিক্ত ব্যথা হলে
  • জ্বর উঠলে অথবা কাঁপুনি দেখা দিলে

ডাক্তার আপনার নিকট থেকে সমগ্র ইতিহাস জেনে কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করবেন। প্রয়োজনে এক্স-রে এবং ক্ষেত্রবিশেষে এমআরআই করতে পরামর্শ দিতে পারেন। পরবর্তীতে সঠিক কারণ নির্ণয় করে সে অনুযায়ী চিকিৎসা দেবেন।

পরিস্থিতি সাপেক্ষে ডাক্তার প্রয়োজনীয় ঔষধ দেবেন। প্রয়োজনে কোনো বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের কাছে রেফার করতে পারেন। এ ছাড়া ফিজিওথেরাপি নেওয়ার পরামর্শও দিতে পারেন।

সতর্কতা

বারবার একই স্থানে মচকানো বা একই মাংসপেশি ছিঁড়ে গেলে, দীর্ঘস্থায়ী সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে। তাই একবার যে স্থানে আঘাতপ্রাপ্ত হোন, সেখানে যাতে পরবর্তীতে আর আঘাত না পড়ে সে ব্যাপারে সচেষ্ট থাকুন।

মচকে যাওয়া ও টান পড়া প্রতিরোধ

মোচড় অথবা মাংসপেশিতে টান পড়তে কিছু উল্লেখযোগ্য কারণ হলো—

  • সঠিকভাবে গরম না হয়ে বা ওয়ার্ম আপ না করে ব্যায়াম অথবা খেলাধুলা করা
  • ভুল নিয়মে অথবা অতিরিক্ত মাত্রায় ব্যায়াম করা অথবা কোনো মাংসপেশি দীর্ঘক্ষণ ব্যবহার করা
  • সঠিক ভঙ্গিমায় পেশি নড়াচড়া না করা
  • অসতর্কতাবশত পড়ে যাওয়া
  • খারাপ ফিটিংস, ভুল সাইজ অথবা উঁচু হিলের জুতা পড়া
  • ভারী জিনিস বহন করা
  • অসমতল জায়গায় হাঁটা

এসব বিষয়ে সতর্ক থাকলে মচকে যাওয়া ও টান পড়ার সম্ভাবনা অনেকাংশে কমে যেতে পারে। এক্ষেত্রে নিচের নিয়মগুলো অনুসরণ করা যায়—

  • ব্যায়াম করা বা খেলতে নামার আগে সঠিকভাবে গা গরম (ওয়ার্ম আপ) করুন।
  • সঠিক নিয়মে সঠিক মাত্রায় ব্যায়াম করুন।
  • কর্মক্ষেত্রে ও খেলাধুলার সময় প্রয়োজনীয় প্রতিরক্ষামূলক সরঞ্জাম পরুন।
  • ক্লান্ত অথবা ব্যথা অনুভব করলে ব্যায়াম ও খেলাধুলা এড়িয়ে চলুন।
  • সঠিক সাইজের ও কম হিলের আরামদায়ক জুতা পরুন।
  • আপনার উচ্চতা অনুযায়ী সঠিক ওজন বজায় রাখুন। অতিরিক্ত ওজন শারীরিক কাঠামোর ওপর অতিরিক্ত চাপ প্রয়োগ করে। ফলে সহজেই কোনো অংশ মচকাতে পারে বা পেশিতে টান পড়তে পারে।
  • আপনার হাড় ও পেশি শক্তিশালী রাখতে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তুলুন।