গর্ভাবস্থায় উচ্চ রক্তচাপ জনিত জটিলতা বা প্রি-এক্লাম্পসিয়া

বেশিরভাগ ক্ষেত্রে প্রি-এক্লাম্পসিয়ার উপসর্গগুলো বেশ মৃদু হয়, তবে দেখা গেলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত

গর্ভাবস্থার শেষ অর্ধেক সময়ে (সাধারণত ২০ সপ্তাহ বা পর থেকে) অথবা সন্তান জন্মের কিছু সময় পরে, কিছু কিছু নারীর প্রি-এক্লাম্পসিয়া দেখা দেয়। ২০ সপ্তাহের আগে প্রি-এক্লাম্পসিয়ার ঘটনা খুব বিরল। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ২৮ থেকে ২৬ সপ্তাহের পরে ও সাধারণত গর্ভাবস্থার একেবারে শেষের দিকে এই সমস্যা দেখা দেয়।

সন্তান জন্মের পরে প্রথম ৬ সপ্তাহের মধ্যেও প্রথমবারের মত এই সমস্যা দেখা যেতে পারে, যদিও এরকম ঘটনা খুব বেশি দেখা যায় না। বেশিরভাগ গর্ভবতী নারীর ক্ষেত্রে প্রি-এক্লাম্পসিয়ার উপসর্গগুলো বেশ মৃদু হয়, তবুও দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া উচিৎ, না হলে বিভিন্ন রকম জটিল উপসর্গ বা শারীরিক জটিলতা দেখা দিতে পারে।

প্রথম দিকে কি কি উপসর্গ দেখা দিতে পারে?

প্রথম দিকে প্রি-এক্লাম্পসিয়ার লক্ষণগুলো হল:

  • উচ্চ রক্তচাপ,
  • প্রস্রাবের সাথে প্রোটিন অর্থাৎ আমিষ বের হয়ে যাওয়া।

এই উপসর্গগুলোর কোনটিই আপনি হয়ত বাড়িতে বসে বুঝতে পারবেন না, কিন্তু আপনার ডাক্তারের কাছে বা নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়মিত গর্ভকালীন পরীক্ষা নিরীক্ষার সময় এগুলো ধরা পড়ে যায়।  

গর্ভবতী নারীদের মধ্যে শতকরা ১০ থেকে ১৫ জনই উচ্চ রক্তচাপে ভোগেন। তাই কেবল রক্তচাপ বেশি হলেই প্রি-এক্লাম্পসিয়া হয়েছে, এমন বলা যাবে না। কিন্তু উচ্চ রক্তচাপের সাথে প্রস্রাবে প্রোটিন গেলে, তা প্রি-এক্লাম্পসিয়াকেই নির্দেশ করে।

আর কি কি উপসর্গ থাকতে পারে?

গর্ভাবস্থার শেষের দিকে প্রি-এক্লাম্পসিয়ার আরও কিছু উপসর্গ দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়, যেমন:

  • প্রচন্ড মাথাব্যথা,
  • চোখে দেখতে সমস্যা হওয়া, যেমন দৃষ্টি ঘোলা হয়ে যাওয়া বা চোখের সামনে আলোর ঝলকের মত দেখতে পাওয়া,
  • প্রচন্ড বুক জ্বালাপোড়া করা,
  • পাঁজরের হাড়ের ঠিক নিচে তীব্র ব্যথা,
  • বমি বমি ভাব বা বমি হওয়া,
  • শরীরে পানি জমে যাওয়ার কারণে ওজন অতিরিক্ত বেড়ে যাওয়া,
  • খুব খারাপ বা অসুস্থ অনুভব করা,
  • শরীরের বিভিন্ন জায়গা, যেমন পায়ের পাতা, গোড়ালি, মুখ ও হাত হঠাৎ ফুলে যাওয়া।

প্রি এক্লাম্পসিয়ার এসব উপসর্গ দেখা দিলে জরুরী ভিত্তিতে ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ করুন।

সময়মত চিকিৎসা না করালে প্রি-এক্লাম্পসিয়ার কারণে কিছু মারাত্মক জটিলতা হতে পারে, যেমন:

  • খিঁচুনি,
  • হেল্প সিনড্রোম (একই সাথে লিভার ও রক্তে সৃষ্ট জটিলতা),
  • স্ট্রোক।

এসব জটিলতাগুলো বিরল হলেও, মা ও অনাগত সন্তানের জন্য এগুলো প্রাণঘাতী হতে পারে।

আপনার অনাগত সন্তানের কি কোন উপসর্গ থাকতে পারে?

প্রি-এক্লাম্পসিয়ার সময় অমরা বা গর্ভফুল (যে অঙ্গটি মা ও সন্তানের রক্ত প্রবাহের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করে) দিয়ে সন্তানের শরীরে ভালোভাবে রক্ত সরবরাহ না হওয়ার কারণে গর্ভের সন্তান স্বাভাবিকের তুলনায় বেশ ধীরে ধীরে বড় হয়।

সঠিক নিয়মে বেড়ে ওঠার জন্য আপনার গর্ভের সন্তানের যতটুকু অক্সিজেন ও পুষ্টি উপাদান প্রয়োজন, তার চেয়ে কম পরিমাণে সরবরাহ হওয়ার কারণে সে ঠিকমত বেড়ে উঠতে পারে না।

এমনটি হলে, গর্ভাবস্থাকালীন নিয়মিত চেক-আপের সময় তা ধরা পড়বে।

সাধারণত কাদের প্রি-এক্লাম্পসিয়া হয়?

গর্ভবতী নারীদের মধ্যে ৬% এর মৃদু প্রি-এক্লাম্পসিয়া হতে পারে। আর ১% থেকে ২% ক্ষেত্রে এটি মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে। 

কিছু কিছু কারণে প্রি-এক্লাম্পসিয়ার ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়, যেমন:

  • গর্ভবতী হওয়ার আগেই ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ বা কিডনীর রোগ থাকলে,
  • আরও কিছু রোগেও প্রি-এক্লাম্পসিয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়, যেমন লুপাস বা এন্টিফসফোলিপিড সিনড্রোম,
  • আগে কখনো যদি গর্ভাবস্থায় প্রি-এক্লাম্পসিয়া হয়ে থাকে।

আরও কিছু কারণে আপনার প্রি-এক্লাম্পসিয়ার ঝুঁকি সামান্য বেশি থাকতে পারে:

  • পরিবারে আপনার মা অথবা বোনের কারো যদি এ সমস্যা হয়ে থাকে,
  • আপনার বয়স যদি ৪০ এর বেশি হয়,
  • এই বারের গর্ভাবস্থা এবং এর আগের গর্ভাবস্থার মধ্যে যদি কমপক্ষে ১০ বছর সময় পার হয়ে যায়,
  • যমজ অর্থাৎ গর্ভে যদি একইসাথে দুই (বা এর বেশি) সন্তান থাকে,
  • আপনার বিএমআই যদি ৩৫ বা তার বেশি হয়।

আপনার যদি এগুলোর মধ্যে ২টি বা তার বেশি উপসর্গ একসাথে থাকে তাহলে ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।

যদি প্রি-এক্লাম্পসিয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে তাহলে ডাক্তার আপনাকে গর্ভাবস্থার ১২ সপ্তাহ থেকে সন্তানের জন্ম হওয়া পর্যন্ত কম ডোজের এসপিরিন নেয়ার পরামর্শ দিতে পারেন। তবে ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া কোনভাবেই এই ওষুধ খাওয়া যাবেনা। 

প্রি-এক্লাম্পসিয়া কেন হয়?

যদিও প্রি-এক্লাম্পসিয়ার সঠিক কারণ জানা নেই, মনে করা হয় অমরা বা গর্ভফুলের (যে অঙ্গটি মা ও সন্তানের রক্ত প্রবাহের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করে) সমস্যা হলে প্রি-এক্লাম্পসিয়া হতে পারে।

প্রি-এক্লাম্পসিয়ার চিকিৎসা কি?

প্রি-এক্লাম্পসিয়া শনাক্ত হলে, আপনাকে দ্রুত একজন বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শে চিকিৎসা নিতে হবে। অবস্থা বেশি মারাত্মক মনে হলে তিনি আপনাকে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পরামর্শ দেবেন। 

হাসপাতালে থাকা অবস্থায় আপনাকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে আপনার অবস্থা কতটুকু মারাত্মক ও আপনাকে কতদিন হাসপাতালে থাকতে হবে সেই ব্যাপারে আপনার চিকিৎসক সিদ্ধান্ত নেবেন।

সাধারণত সন্তান প্রসবের পর পরই প্রি-এক্লাম্পসিয়া ভালো হয়ে যায় । তাই যতক্ষণ পর্যন্ত নিরাপদে সন্তান প্রসব করানো সম্ভব হচ্ছে না, ততক্ষণ পর্যন্ত আপনাকে পর্যবেক্ষণে রাখা হবে ।

সাধারণত গর্ভাবস্থার ৩৭ থেকে ৩৮ সপ্তাহের মধ্যে নিরাপদে সন্তান প্রসব করানো যায় । কিন্তু অবস্থা মারাত্মক হয়ে গেলে আরও আগে কৃত্রিমভাবে বা ওষুধ প্রয়োগের মাধ্যমে আপনার প্রসব করানোর চেষ্টা করা হতে পারে অথবা অপারেশন বা সিজারিয়ান সেকশন ও করা হতে পারে।

প্রসবের আগ পর্যন্ত রক্তচাপ কমানোর জন্য আপনাকে ওষুধ দেয়া হতে পারে।

প্রি-এক্লাম্পসিয়ার কারণে কি জটিলতা দেখা দিতে পারে?

যদিও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই প্রি-এক্লাম্পসিয়া হলে তেমন কোন সমস্যা হয় না ও সন্তান জন্মের পর এ অবস্থা ভালো হয়ে যায়, তারপরও মা ও শিশুর কিছু জটিলতার ঝুঁকি থেকেই যায়।

কিছু ক্ষেত্রে মায়ের খিঁচুনি হতে পারে, যাকে ‘এক্লাম্পসিয়া’ বলা হয় এবং এটি মা ও গর্ভের সন্তানের জীবনের জন্য হুমকিস্বরুপ। তবে এই ঘটনা সাধারণত বিরল।