1. গর্ভধারণ

সন্তান নেওয়ার সঠিক বয়স

সন্তান নেওয়ার সঠিক বয়স

প্রথমবার বাচ্চা নেওয়ার সঠিক সময় কখন — এই প্রশ্নের উত্তরে অনেকেই হয়তো শুনে থাকবেন যে ৩০ বছর বয়সের আগে বাচ্চা নিয়ে নেওয়া উচিৎ। তবে মোটা দাগের এই উত্তরটি সবার জন্য প্রযোজ্য নয়। একটি দম্পতি কয়টি বাচ্চা চান, তার উপরে ভিত্তি করে বাচ্চা নেওয়ার বয়সটাও ভিন্ন হবে।

মাসিক চক্রের কোন সময়ে সহবাস করলে গর্ভধারণের সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি থাকে সেই বিষয়ে জানতে গর্ভবতী হওয়ার সঠিক সময় আর্টিকেলটি দেখতে পারেন।

একটি সন্তান চাইলে যে বয়সে বাচ্চা নেওয়ার চেষ্টা শুরু করা প্রয়োজন, তিনটি নিতে চাইলে তার অনেক আগে থেকেই চেষ্টা করতে হবে। এছাড়া সন্তান ধারণে সমস্যা হওয়ার সম্ভাবনা থাকতে পারে এমন উপসর্গগুলো লক্ষ করা গেলে আগে থেকেই ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। এই উপসর্গগুলো এই আর্টিকেলের নিচের অংশে উল্লেখ করা হয়েছে।

তাছাড়া একটি দম্পতির জীবনের লক্ষ্য, পড়াশোনা, ক্যারিয়ার, আর্থিক অবস্থা — এমন অনেকগুলো ব্যক্তিগত বিষয়ের ওপরে সন্তান নেওয়ার আদর্শ সময় নির্ভর করে। সবদিক বিবেচনা করার পর সিদ্ধান্তটা একান্তই আপনার এবং আপনার সঙ্গীর। সিদ্ধান্তটি সহজ করতে বিভিন্ন পরিপ্রেক্ষিতে যে বয়সে বাচ্চা নেওয়ার চেষ্টা শুরু করা উচিত, সেই বিষয়টি চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে এখানে তুলে ধরা হয়েছে।

বাচ্চা নেওয়ার ক্ষমতা কোন বয়স থেকে এবং কত দ্রুত কমে?

পুরুষের ক্ষেত্রে ৫০ বছর বয়সের আগে প্রজনন ক্ষমতা খুব একটা কমে না। তবে নারীদের ক্ষেত্রে সন্তান ধারণের ক্ষমতা বয়সের সাথে সাথে অনেকটা কমে যায়। একজন নারীর বয়সের সাথে সন্তান ধারণের সম্ভাবনার সম্পর্ক নিচের ছবিতে দেখানো হয়েছে।

বাচ্চা নেওয়ার সঠিক সময় কখন
নারীর বয়সের অনুপাতে সন্তান ধারণের সম্ভাবনার সম্পর্ক

উপরের গ্রাফ থেকে দেখা যাচ্ছে যে ৩০ বছর বয়স পর্যন্ত নারীদের সন্তান ধারণের ক্ষমতা খুবই ভালো থাকে। এরপরে তা দ্রুত কমতে শুরু করে। ৩৫ বছর পেরিয়ে যাওয়ার পর এটি আরও অনেকখানি কমে যায়।

একটি ছেলে শিশু শরীরে শুক্রাণু নিয়ে জন্মায় না, বয়ঃসন্ধিকালে দেহে শুক্রাণু তৈরি হওয়া শুরু হয়। একজন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের শরীরে প্রতিদিন প্রায় ৩০ কোটি শুক্রাণু তৈরি হয়।

অপরদিকে, একটি মেয়ে শিশু জন্মের সময়ে নির্দিষ্টই সংখ্যক ডিম্বাণুগুলো নিয়ে জন্মে। সেটাই পরবর্তী জীবনে তার সন্তান ধারণের পুঁজি। প্রতি মাসিক চক্রে একটি করে ডিম্বাণু পরিপক্ব হয়, এর সাথে আরো কিছু ডিম্বাণু এই প্রক্রিয়ায় পরিপক্ব হওয়ার আগেই নষ্ট হয়ে যায়। ফলে বয়সের সাথে সাথে ডিম্বাণুর সংখ্যা কমতে থাকে।

যেহেতু জন্মের পরে নারীদের শরীরে নতুন করে কোনো ডিম্বাণু তৈরি হয় না, তাই বয়স বাড়ার সাথে সাথে তাদের প্রজনন ক্ষমতা কমতে থাকে। জন্মগ্রহণের সময়ে একজন মেয়ে শিশুর ডিম্বাশয়ে প্রায় ১০ লাখ থেকে ২০ লাখ ডিম্বাণু থাকে, ৩৭ বছর বয়সে তা কমে মাত্র ২৫,০০০ হাজারে গিয়ে পৌঁছে।

এখন উপরের গ্রাফটি দেখে মনে হতে পারে যে, ২০ থেকে ৩০ বছর বয়স পর্যন্ত একজন নারীর সন্তান ধারণের ক্ষমতা যেহেতু প্রায় একই রকম থাকে, তাহলে ৩০ বছর বয়সে বাচ্চা নেওয়ার চেষ্টা শুরু করলেও হবে। তবে ব্যাপারটা তেমন নয়। একটি দম্পতি কয়টা সন্তান নিতে চান সে সংখ্যা অনুযায়ী আরও আগে চেষ্টা শুরু করতে হতে পারে।

কোন বয়স থেকে বাচ্চা নেওয়ার চেষ্টা করা উচিত?

যে দম্পতি ১টি সন্তান চান, তারা যদি ৩২ বছর বয়সে বাচ্চা নেওয়ার চেষ্টা  শুরু করেন, তাহলে তাদের সফলতার সম্ভাবনা থাকে ৯০ শতাংশ। এর পর থেকে সেই সম্ভাবনা আস্তে আস্তে কমে যাবে। ৩৭ বছর বয়সে গর্ভধারণের সম্ভাবনা নেমে আসে ৭৫ শতাংশে। আর ৪১ বছর বয়সে তা ৫০ শতাংশে নেমে যায়।

২টি সন্তান নিতে চাইলে, ২৭ বছর বয়সে চেষ্টা শুরু করলে সফলতার সম্ভাবনা থাকে ৯০ শতাংশ। ৩৪ বছর বয়সে সেই সম্ভাবনা কমে ৭৫ শতাংশে চলে যায়। আর বয়স যদি ৩৮ বছর হয়ে যায়, তবে বাচ্চা হওয়ার সম্ভাবনা নেমে আসে ৫০ শতাংশে।

৩টি সন্তান নিতে চাইলে, ২৩ বছর বয়সে চেষ্টা করতে শুরু করলে সফলতার সম্ভাবনা থাকে ৯০ শতাংশ। ৩১ বছর বয়সে বাচ্চা নেওয়ার চেষ্টা শুরু করলে সেই সম্ভাবনা কমে ৭৫ শতাংশে আসে। আর ৩৫ বছর বয়সে গিয়ে সম্ভাবনা থাকে ৫০ শতাংশ।

সহজে বোঝার জন্য নিচের তালিকাটি দেখুন। এখানে একটি, দুটি বা তিনটি সন্তান নেওয়ার জন্য নারীর সর্বোচ্চ যে বয়সে বাচ্চা নেওয়ার চেষ্টা করলে শতকরা ৫০, ৭৫ ও ৯০ শতাংশ সাফল্য মিলবে তা তুলে ধরা হয়েছে।

সন্তান ধারণে সফল হওয়ার সম্ভাবনাএক সন্তানের জন্য সর্বোচ্চ বয়সদুই-সন্তানের জন্য সর্বোচ্চ বয়সতিন-সন্তানের জন্য সর্বোচ্চ বয়স
৫০%৪১৩৮৩৫
৭৫%৩৭৩৪৩১
৯০%৩২২৭২৩

সিদ্ধান্ত সম্পূর্ন আপনার ও আপনার সঙ্গীর

সন্তান গ্রহণের ক্ষেত্রে ৯০ শতাংশ সফলতার সম্ভাবনা চাইবেন, নাকি ৭৫ বা ৫০ শতাংশ – এটা একান্তই একটি দম্পতির নিজস্ব সিদ্ধান্ত। কিছু কিছু দম্পতির কাছে সন্তান নেওয়াই সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ, এজন্য তারা সব ধরনের চেষ্টা করতে রাজি থাকেন। তারা হয়তো ৯০ শতাংশ সম্ভাবনা থাকার সময়টাকে বেছে নেবেন।আবার কেউ কেউ জীবনের বিভিন্ন অবস্থা বিবেচনা করে ৭৫ শতাংশ সম্ভাবনা থাকার সময়টাকে বেছে নেন। সব দিক বিবেচনা করে বাস্তবসম্মত ধারণা নিয়ে আপনাকে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করাই আর্টিকেলটির উদ্দেশ্য।

সন্তান ধারণে সমস্যা হওয়ার সম্ভাবনা থাকলে লক্ষণগুলো সম্পর্কে সচেতন হয়ে আগে থেকে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। এই লক্ষণগুলো নিচে তুলে ধরা হলো যাতে আপনার অবস্থার সাথে মিলিয়ে নিতে পারেন।

কিভাবে বুঝবেন গর্ভধারণে সমস্যা হতে পারে?

সন্তান ধারণে সমস্যা হওয়ার সম্ভাবনা আছে কি না সে ব্যাপারে ধারণা পেতে নিচের লক্ষণগুলো জেনে নিন। এসব লক্ষণ থাকলে আগে থেকেই ব্যবস্থা নেওয়া ভালো। লক্ষণগুলো দেখা দিলেই যে সন্তান হবে না এমন নয়। এগুলো সমস্যা দেখা দেয়ার সম্ভাবনা মাত্র। 

এমন লক্ষণ দেখা দিলে কিছু পরীক্ষা নিরীক্ষা করতে হতে পারে, কারও ক্ষেত্রে একটু আগে থেকেই সন্তান নেওয়ার চেষ্টা করার প্রয়োজন হতে পারে। তবে শুরুতেই ঘাবড়ে যাওয়ার কারণ নেই। দেরী না করে আগে থেকেই চিকিৎসকের সাথে কথা পরামর্শ করে রাখা ভালো।

গর্ভধারণে সমস্যা হতে পারে এমন ৬টি লক্ষণ হলো—

  • ১. অনিয়মিত মাসিক
  • ২. ৩৫ দিনের চেয়েও দেরীতে মাসিক হওয়া
  • ৩. ২১ দিনের আগেই পরবর্তী মাসিক শুরু হওয়া
  • ৪. মাসিক বন্ধ হয়ে যাওয়া
  • ৫. মাসিকের সময় প্রচুর রক্তক্ষরণ হওয়া
  • ৬. মাসিকের সময় প্রচণ্ড ব্যথা হওয়া

এসব লক্ষণ সাধারণত থাইরয়েডের সমস্যা, পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম (PCOS), ফাইব্রয়েড (জরায়ুর টিউমার), এন্ডোমেট্রিয়োসিসের মতো রোগ হলে দেখা যায়। এমন স্বাস্থ্য সমস্যা থাকলে দ্রুত একজন চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

পুরুষদের সন্তান নেওয়ার ক্ষমতা

পুরুষদের প্রজনন ক্ষমতা কমলে সাধারণত বাইরে থেকে কোন লক্ষণ দেখা যায়। তাই স্ত্রীর গর্ভধারণের দিকগুলো ঠিক থাকলেও, অনেকদিন ধরে স্বাভাবিকভাবে সন্তান নেওয়ার চেষ্টা পরেও সফলতা নাও আসতে পারে। শুক্রাণু পরীক্ষা করার মাধ্যমে পুরুষের প্রজনন ক্ষমতা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়। এমন সমস্যার ক্ষেত্রে একজন ফার্টিলিটি বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে।