গর্ভাবস্থা ও হাই ব্লাড প্রেশার (উচ্চ রক্তচাপ)

গর্ভাবস্থা ও হাই ব্লাড প্রেশার (উচ্চ রক্তচাপ)

গর্ভধারণের আগে থেকে যদি আপনার হাই ব্লাড প্রেশার অর্থাৎ উচ্চ রক্তচাপজনিত সমস্যা থেকে থাকে, অথবা গর্ভাবস্থায় প্রথমবারের মতো এর লক্ষণ প্রকাশ পায়, তাহলে এই আর্টিকেলটি পড়ুন।

উচ্চ রক্তচাপ বা হাই ব্লাড প্রেশার কীভাবে বুঝবো?

হাই ব্লাড প্রেশারকে ৩টি শ্রেণীতে ভাগ করা যায়:

মৃদু: এখানে ব্লাড প্রেশার ১৪০/৯০ mmHg (mmHg = মিলিমিটার মার্কারি) থেকে ১৪৯/৯৯ mmHg এর মাঝে থাকে। এমনটা হলে ব্লাড প্রেশার নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হয়, কিন্তু সাধারণত কোনো চিকিৎসার প্রয়োজন হয় না।

মাঝারি: এখানে ব্লাড প্রেশার ১৫০/১০০ mmHg থেকে ১৫৯/১০৯ mmHg এর মাঝে থাকে।

তীব্র: এক্ষেত্রে রক্তচাপ ১৬০/১১০ mmHg কিংবা তার চেয়েও বেশি হয়ে যায়।

হাই প্রেশারের রোগীর করণীয়

ব্লাড প্রেশার নিয়ন্ত্রণে রাখতে আপনার যদি নিয়মিত ওষুধ সেবনের প্রয়োজন হয়, তাহলে গর্ভধারণের জন্য চেষ্টা করার আগেই কোনো ডাক্তার বা গাইনী ও প্রসূতিবিদ্যা বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিয়ে নিন। গর্ভধারণ করার আগেই ডাক্তার ওষুধ পরিবর্তন করে দিতে পারেন।

কোন ধরনের পরিকল্পনা ছাড়াই গর্ভধারণ করে ফেললে, দ্রুত ডাক্তারকে জানান। যত দ্রুত সম্ভব আপনার ওষুধ পরিবর্তন করার প্রয়োজন হতে পারে।

এটা করা প্রয়োজন কারণ কিছু ওষুধ আছে যা গর্ভাবস্থায় সেবন করা গর্ভের সন্তানের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। ওই ওষুধগুলো আপনার গর্ভফুলে ও গর্ভের সন্তানের দেহে রক্ত চলাচল কমিয়ে দিয়ে অথবা অন্য কোনো উপায়ে ক্ষতি করতে পারে।

প্রতিটি গর্ভকালীন চেক-আপের সময় আপনার নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রের স্বাস্থ্যকর্মী বা ডাক্তার নিবিড়ভাবে আপনার রক্তচাপ পর্যবেক্ষণ করবেন, যেন:

  • আপনার উচ্চ রক্তচাপের জন্য গর্ভের সন্তানের বৃদ্ধি যেন বাধাগ্রস্ত না হয়,
  • আপনার যেন প্রি-এক্লাম্পসিয়া না হয়ে যায়।

এজন্য গর্ভকালীন কোনো চেকআপ যেন বাদ না যায় তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

গর্ভাবস্থার পুরো সময়কালকে দুইভাগে ভাগ করলে দেখা যায়, প্রথম অর্ধেকে কিছু নারীর ব্লাড প্রেশার কমে যায়। এ সময়ে হয়তো আপনি কিছুদিনের জন্য ওষুধ সেবন বন্ধ রাখতে পারেন। তবে ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া এমন কিছু করা যাবে না।

হাই প্রেশার কমানোর উপায়

নিয়মিত হাঁটলে কিংবা সাঁতার কাটলে শরীর সচল থাকে, যা আপনার প্রেশার নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করতে পারে। পরিমাণমত সুষম খাবার খাওয়া এবং লবণ খাওয়ার পরিমাণ কমিয়ে দিলেও তা প্রেশার কমিয়ে দেয়।

অনেকের ধারণা যে ম্যাগনেসিয়াম, ফলিক এসিড অথবা মাছের তেলের মত সাপ্লিমেন্ট উচ্চ রক্তচাপ প্রতিরোধে সাহায্য করতে পারে। তবে এরকম তথ্যের পক্ষে যথেষ্ট প্রমাণ নেই।

প্রি-এক্লাম্পসিয়া

এই সমস্যাটি  সাধারণত গর্ভধারণের ২০তম সপ্তাহের পরে কিছু কিছু গর্ভবতী মায়েদের ক্ষেত্রে দেখা দেয়।

এটি গর্ভফুল/অমরার কারণে সৃষ্ট একটি স্বাস্থ্য সমস্যা যা আপনার ব্লাড প্রেশার বাড়িয়ে দেয়। সময়মত চিকিৎসা না নিলে এটি আপনার ও আপনার গর্ভের সন্তানের জন্য বড় ধরনের বিপদ ডেকে আনতে পারে।

কাদের প্রি-এক্লাম্পসিয়া হওয়ার সম্ভাবনা বেশি?

যাদের প্রি-এক্লাম্পসিয়া হওয়ার সম্ভাবনা বেশি—

  • গর্ভধারণের আগে থেকেই আপনার হাই প্রেশারের সমস্যা থাকে,
  • আগের কোন সন্তান গর্ভে থাকার সময়ে আপনার এক্লাম্পসিয়া হয়ে থাকে, 
  • আপনার মা বা বোনের কখনো প্রি-এক্লাম্পসিয়া হয়ে থাকে।

তাহলে প্রি-এক্লাম্পসিয়া হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়, তাই নিয়মিত চেকআপে গিয়ে আপনার ব্লাড প্রেশার ও প্রস্রাব পরীক্ষা করানো আরও গুরত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়।

প্রসবের সময় এবং সন্তান জন্ম

আপনি গর্ভাবস্থায় হাই প্রেশারের জন্য ওষুধ সেবন করে থাকলে, প্রসবের সময়েও তা সেবন নিয়মানুযায়ী সেবন করুন।

আপনার মৃদু বা মাঝারি হাই ব্লাড প্রেশার থাকলে, প্রসব বেদনা ওঠার পরে ঘণ্টায় ঘণ্টায় আপনার ব্লাড প্রেশার পর্যবেক্ষণ করতে হবে। ব্লাড প্রেশার স্বাভাবিকের মধ্যে থাকলে আপনার সন্তানের জন্ম প্রাকৃতিকভাবে অর্থাৎ “নরমাল” এই হওয়া সম্ভব।

আপনার যদি তীব্র হাই ব্লাড প্রেশার থাকে, তাহলে প্রসব বেদনা ওঠার পরে নিরবচ্ছিন্নভাবে আপনার ব্লাড প্রেশার পর্যবেক্ষণ করা হবে। ডাক্তাররা আপনার সন্তানের ডেলিভারীর জন্য ফোর্সেপ বা ভেন্টাউস-এর ব্যবহার, কিংবা প্রয়োজনবোধে সিজারিয়ান সেকশন অপারেশন করানোর পরামর্শ দিতে পারেন।

সন্তান প্রসবের পরেও আপনার ব্লাড প্রেশার পর্যবেক্ষণ করা হবে। যদি গর্ভবতী হওয়ার আগে থেকে আপনার হাই ব্লাড প্রেশারের সমস্যা থাকে, তাহলে সন্তান প্রসব করার ২ সপ্তাহ পর আপনার হাই প্রেশারের চিকিৎসা যেভাবে আছে সেভাবেই চলবে কিনা সে সম্পর্কে ডাক্তারের সাথে আলোচনা করা প্রয়োজন।

আপনার যদি গর্ভবতী অবস্থায় উচ্চ রক্তচাপের সমস্যা শুরু হয়ে থাকে, এবং প্রসবের ২ সপ্তাহ পরেও আপনি ওষুধ সেবন চালিয়ে যান, তাহলে ওষুধ খাওয়া বন্ধ করে দিতে পারবেন কি না কিংবা চিকিৎসায় কোনো পরিবর্তন আনার প্রয়োজন আছে কি না তা জানার জন্য ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।

গর্ভাবস্থায় হাই প্রেশারে ভুগে থাকলে, প্রসবের ৬ সপ্তাহ পরে  ‘প্রসব-পরবর্তী চেকআপ’-এর সময় অবশ্যই ডাক্তারের সাথে সাক্ষাত করা উচিত।

প্রেশারের ওষুধ সেবন করলে নবজাতককে কি বুকের দুধ খাওয়ানো যাবে?

ব্লাড প্রেশারের ওষুধগুলো বুকের দুধে যায় কি না অথবা নবজাতকের দেহে কোনো প্রভাব ফেলে কি না সে সম্পর্কে খুব বেশি তথ্য নেই।

গর্ভাবস্থায় ব্লাড প্রেশার নিয়ন্ত্রণের জন্য যেসব ওষুধ দেওয়া হয়, দেখা গেছে সন্তানের জন্মের পর এবং তাকে বুকের দুধ খাওয়ানোর সময়েও সেগুলো সেবন করা নিরাপদ।

যদি আপনি ওষুধ খাওয়া চালিয়ে যান, তাহলে নবজাতককে বুকের দুধ খাওয়ানোর ব্যাপারে ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে নিন।