1. গর্ভধারণ

গর্ভাবস্থায় বমি বা মর্নিং সিকনেস

গর্ভাবস্থায় বমি বা মর্নিং সিকনেস

গর্ভাবস্থার শুরুর দিকে  প্রায়ই বমি বমি ভাব বা বমি হয়, একে মর্নিং সিকনেস বলা হয়ে থাকে। তবে দিনের যেকোন সময়, এমনকি রাতেও এমন হতে পারে। অনেকে সারাদিনই বমি বমি ভাব বোধ করেন।

মর্নিং সিকনেস একটি অস্বস্তিকর অবস্থা, যার কারণে অনেকে স্বাভাবিক নিয়মে কাজকর্মও চালিয়ে যেতে পারেন না। তবে সাধারণত এটি আপনার সন্তানকে অতিরিক্ত কোন ঝুঁকির মধ্যে ফেলে না ও গর্ভাবস্থার ১৬ থেকে ২০ সপ্তাহের মধ্যে এটি ভালো হয়ে যায়। 

অনেক সময় বমির সমস্যাটি মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে, যাকে ডাক্তারি ভাষায় বলা হয় হাইপারএমেসিস গ্র্যাভিডেরাম (Hyperemesis Gravidarum)। এর কারণে আপনার দেহে পানিশূন্যতা, এমনকি পুষ্টির অভাব দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা থাকে, ফলে যেকোন সময় এটি আপনার ও আপনার সন্তানের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। এমনটি হলে আপনার বিশেষ চিকিৎসা দরকার, প্রয়োজনে হাসপাতালেও চিকিৎসা নিতে হতে পারে।

মাঝে মাঝে প্রস্রাবের রাস্তায় ইনফেকশনের কারণেও বমি ভাব বা বমি হতে পারে। এ ইনফেকশন সাধারণত মূত্রথলিকে আক্রান্ত করে, তবে সময়মত চিকিৎসার অভাবে কিডনীতেও এ ইনফেকশন ছড়িয়ে যেতে পারে।

বমির সাথে নিচের উপসর্গগুলো থাকলে দ্রুত ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ করুন :

  • প্রস্রাবের রঙ অনেক গাঢ় হলে ও ৮ ঘন্টার বেশি সময়ের মধ্যে প্রস্রাব না হলে।
  • ২৪ ঘন্টার মধ্যে যা খাচ্ছেন বা পান করছেন, তার সব কিছুই বমির সাথে বের হয়ে গেলে।
  • দাঁড়ানোর সময় অনেক দুর্বল লাগলে, মাথা ঘোরালে বা অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার মত মনে হলে।
  • পেট ব্যথা থাকলে।
  • প্রস্রাবের সময় ব্যথা হলে বা প্রস্রাবের সাথে রক্ত গেলে।
  • ওজন কমে গেলে। 

এগুলো পানিশূন্যতা বা প্রস্রাবের রাস্তায় ইনফেকশনের উপসর্গ হতে পারে।

গর্ভাবস্থায় বমি বা মর্নিং সিকনেসের চিকিৎসা

দুর্ভাগ্যবশত এমন কোন ধরাবাধা চিকিৎসা নেই যা সবার মর্নিং সিকনেসের জন্য সমানভাবে কার্যকর। এক এক জনের গর্ভাবস্থার অভিজ্ঞতা এক এক রকম।

উপসর্গগুলো কমানোর জন্য আপনি আপনার খাদ্যতালিকা ও দৈনন্দিন জীবনে কিছু পরিবর্তন করতে পারেন। এই পদক্ষেপগুলো যদি আপনার জন্য কার্যকর না হয় বা আপনার উপসর্গ আরও বাড়তে থাকে তাহলে ডাক্তারের পরামর্শে ওষুধ সেবন করুন।

গর্ভাবস্থায় বমি বা মর্নিং সিকনেস কমানোর ঘরোয়া উপায়

আপনার মর্নিং সিকনেস যদি অতটা গুরুতর না হয় তাহলে ডাক্তার বা নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রের স্বাস্থ্যকর্মী আপনাকে দৈনন্দিন জীবনে কিছু পরিবর্তন আনার পরামর্শ দিতে পারেন:

  • প্রচুর বিশ্রাম নিন ( ক্লান্তির কারণে বমি ভাব আরও বাড়তে পারে)।
  • যেসব খাবার বা গন্ধে আপনার খারাপ লাগে বা বমি ভাব হয় সেগুলো এড়িয়ে চলুন।
  • ঘুম থেকে ওঠার পর শুকনো টোস্ট বা বিস্কুট জাতীয় কোন খাবার খান।
  • অল্প পরিমাণে ও কিছুক্ষণ পর পর এমন খাবার খাবেন যাতে শর্করার পরিমাণ বেশি ও চর্বির পরিমাণ কম (যেমন: রুটি, ভাত, বিস্কুট ইত্যাদি)।
  • গরম খাবারের গন্ধে খারাপ লাগলে গরম খাবার না খেয়ে ঠান্ডা খাবার খান ।
  • প্রচুর পরিমাণে তরল পানীয় বিশেষত পানি পান করুন (অল্প অল্প করে কিছুক্ষণ পর পর খেলে তা বমি প্রতিরোধ করতে সাহায্য করবে)।
  • আদা আছে এমন পানীয় বা খাবার খেতে পারেন। কিছু গবেষণায় দেখা গিয়েছে আদা বমি ভাব ও বমি কমাতে সাহায্য করতে পারে (প্রয়োজনে আপনার ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে নিন)।
  • আকুপ্রেশার প্রয়োগ করে দেখতে পারেন। কিছু গবেষণায় দেখা গিয়েছে বাহুতে একটি বিশেষ ব্যান্ড ব্যবহার করে হাতের কব্জিতে চাপ প্রয়োগ করলে তা উপসর্গ উপশমে কিছুটা সাহায্য করতে পারে।

গর্ভাবস্থায় বমির ওষুধ

বমি ভাব ও বমি যদি খুব মারাত্মক হয় ও এসব পরিবর্তন আনার পরও এ অবস্থার কোন উন্নতি না হয়, তাহলে ডাক্তার আপনাকে অল্প সময়ের জন্য কিছু বমির ওষুধ দিতে পারেন। এই ওষুধগুলোকে ডাক্তারি ভাষায় বলা হয় ‘এন্টিএমেটিক’। এগুলো গর্ভাবস্থায় ব্যবহার করা নিরাপদ।

এগুলোর কোন কোনটি এক ধরনের এন্টিহিস্টামিন জাতীয় ওষুধ, যা এলারজির জন্য ব্যবহার করা হয়, কিন্তু বমির ওষুধ হিসেবেও এগুলো কাজ করে। এ ওষুধ সাধারণত আপনাকে মুখে খাওয়ার  ট্যাবলেট হিসেবে দেয়া হবে।কিন্তু এতেও কাজ না হলে ডাক্তার আপনাকে ইনজেকশন বা সাপোজিটরি ( এক ধরনের ওষুধ যা পায়ুপথে দেয়া হয়) ব্যবহারের পরামর্শ দিতে পারেন।

গর্ভাবস্থায় কখন বমি বা মর্নিং সিকনেস বেশি হয়?

গর্ভাবস্থার প্রথম ১২ সপ্তাহে হরমোনের পরিবর্তনকে মর্নিং সিকনেসের একটি অন্যতম কারণ বলে মনে করা হয়।

কিন্তু আরও কিছু কারণে আপনার ঝুঁকি অন্যদের তুলনায় বেশি হতে পারে:

  • আপনার গর্ভে যদি যমজ অর্থাৎ দুই বা তার বেশি সন্তান থাকে,
  • আগে কখনো গর্ভধারণের সময় যদি আপনার মারাত্মক বমি ভাব ও বমি হয়ে থাকে, 
  • যাদের গাড়ীতে উঠলে বমি ভাব বা বমির সমস্যা হয় অর্থাৎ ‘মোশন সিকনেস’ থাকলে,
  • যদি আগে থেকেই মাইগ্রেনের সমস্যা থাকে,
  • পরিবারে মা অথবা বোনের যদি মর্নিং সিকনেসের সমস্যা থাকে,
  • গর্ভধারণের আগে কখনো এস্ট্রোজেনযুক্ত জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি খেলে যদি আপনার বমি বমি ভাব হয়ে থাকে ,
  • প্রথমবার গর্ভবতী হলে,
  • আপনার ওজন স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি হলে ( বিএমআই ৩০ এর বেশি),
  • কোন মানসিক চাপের মধ্যে থাকলে।