1. গর্ভধারণ

গর্ভকালীন ডায়াবেটিসের লক্ষণ ও করনীয়

গর্ভকালীন ডায়াবেটিসের লক্ষণ ও করনীয়

গর্ভকালীন সময়ে গর্ভবতী মায়ের রক্তে সুগারের পরিমাণ স্বাভাবিক মাত্রার চেয়ে বেড়ে গেলে তাকে গর্ভকালীন ডায়াবেটিস (Gestational Diabetes Mellitus) বলা হয়। এটি সাধারণত সন্তান প্রসবের পরে ঠিক হয়ে যায়। গর্ভাবস্থার যেকোনো ধাপে এই গর্ভকালীন ডায়াবেটিস হতে পারে, তবে ২য় বা ৩য় ত্রৈমাসিকের (৪র্থ থেকে ৯ম মাসের) সময় এটি হওয়া বেশি কমন।

যখন আপনার শরীর গর্ভকালীন সময়ের বাড়তি চাহিদা অনুযায়ী ইনসুলিন তৈরি করতে পারেনা, তখন এই সমস্যাটি দেখা দেয়। ইনসুলিন হল এমন একটি হরমোন যা রক্তে সুগারের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে।

গর্ভকালীন ডায়াবেটিস গর্ভাবস্থায় ও প্রসবের পরে আপনার ও আপনার সন্তানের জন্য বিভিন্ন সমস্যার কারণ হতে পারে। তবে যদি এটি প্রাথমিক অবস্থায় ধরা পড়ে এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসার ব্যবস্থা নেয়া হয় তবে সমস্যাগুলোর ঝুঁকি অনেকটাই কমে আসে। আপনার ও আপনার গর্ভের সন্তানের ওপর গর্ভকালীন ডায়াবেটিস কী ধরনের ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে তা জানতে পারবেন এই লেখায়।

গর্ভকালীন ডায়াবেটিসের ঝুঁকিতে রয়েছেন কারা?     

যেকোন গর্ভবতী নারী গর্ভকালীন ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হতে পারেন, তবে কারও কারও ক্ষেত্রে ঝুঁকিটা অন্যদের তুলনায় বেশি। এই ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ার অন্যতম কারণগুলো হল:

  • অতিরিক্ত ওজন। আপনার BMI যদি ৩০ এর চেয়ে বেশি হয়;
  • অতীতে আপনার কোন সন্তান যদি ৪.৫ কেজি (১০ পাউন্ড) বা এর বেশি ওজন নিয়ে জন্মগ্রহণ করে থাকে; 
  • আগে যদি আপনি গর্ভধারণ করে থাকেন, এবং সেই সময় যদি আপনার গর্ভকালীন ডায়াবেটিস হয়ে থাকে;
  • আপনার বাবা-মা, ভাই-বোনের মধ্যে কারও যদি ডায়াবেটিস হয়ে থাকে;
  • দক্ষিণ এশীয়, কৃষ্ণাঙ্গ, আফ্রিকান- ক্যারিবিয়ান বা মধ্যপ্রাচ্যের অধিবাসীদের ক্ষেত্রে গর্ভকালীন ডায়াবেটিসের প্রবণতা বেশি দেখা যায়।

এই পাঁচটি ক্ষেত্রের মধ্যে কোনোটি আপনার জন্য প্রযোজ্য হলে গর্ভাবস্থায় আপনার ডায়াবেটিস পরীক্ষা করিয়ে নেওয়া উচিত।   

গর্ভকালীন ডায়াবেটিসের লক্ষণ

গর্ভকালীন ডায়াবেটিসের সাধারণত কোন বিশেষ লক্ষণ থাকে না।  

অধিকাংশ ক্ষেত্রেই গর্ভকালীন চেকআপের সময় এটি ধরা পড়ে। তবে কারও কারও ক্ষেত্রে রক্তে সুগারের মাত্রা অনেকখানি বেড়ে গেলে কিছু লক্ষণ দেখা দিতে পারে, যেমন:

  • ঘন ঘন পিপাসা লাগা,
  • আগের তুলনায় ঘনঘন প্রস্রাবের বেগ আসা,
  • মুখ শুকিয়ে যাওয়া, ও
  • ক্লান্ত বোধ করা।

এই লক্ষণগুলো দেখা দেওয়া মানেই যে আপনার গর্ভকালীন ডায়াবেটিস হয়েছে, তা নয়। কিছু লক্ষণ স্বাভাবিকভাবেই গর্ভাবস্থায় দেখা যায়। তবে আপনার মধ্যে যদি এমন কোন লক্ষণ থাকে, আর তা নিয়ে আপনি চিন্তিত বোধ করেন, তবে ডাক্তারের পরামর্শ নিন৷  

গর্ভকালীন ডায়াবেটিস কী ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে?       

বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই গর্ভকালীন ডায়াবেটিস থাকার পরেও গর্ভকাল অনেকটাই স্বাভাবিক থাকে, এবং গর্ভের সন্তানও সুস্থভাবেই জন্মগ্রহণ করে।  

তবে কিছু ক্ষেত্রে গর্ভের শিশুর কিছু সমস্যা হতে পারে এবং প্রসবকালীন নানা জটিলতা দেখা দিতে পারে। যেমন:

  • সন্তান আকারে স্বাভাবিকের চেয়ে বড় হওয়া। এর ফলে প্রসবের সময় বিভিন্ন জটিলতা দেখা দিতে পারে। কৃত্রিমভাবে ওষুধ দিয়ে প্রসবের প্রক্রিয়া শুরু করা (induced labour) বা সিজারিয়ান পদ্ধতিতে অপারেশন করে সন্তান প্রসবের প্রয়োজন হতে পারে।
  • গর্ভাবস্থার ৩৭তম সপ্তাহ পূর্ণ হওয়ার আগেই সন্তান প্রসব হয়ে যাওয়া। একে বলা হয় প্রিম্যাচিউর লেবার
  • শিশু গর্ভে যেই তরল দিয়ে ঘেরা থাকে (অ্যামনিওটিক তরল) তার পরিমাণ বেশি হলে সঠিক সময়ের আগেই প্রসব হয়ে যেতে পারে। একে বলে পলিহাইড্রামনিওস
  • গর্ভবতী অবস্থায় ব্লাড প্রেশার বেড়ে যাওয়া সংক্রান্ত সমস্যা। চিকিৎসা না করালে এটি গর্ভকালীন বিভিন্ন মারাত্মক জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে। একে প্রি-এক্লাম্পসিয়া বলে।
  • জন্মের পর আপনার শিশুর শরীরে সুগারের মাত্রা কমে যাওয়া বা শিশুর শরীরের ত্বক ও চোখের সাদা অংশ হলদেটে হয়ে যাওয়া (জন্ডিস হওয়া) – এর ফলে শিশুকে হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা করানোর প্রয়োজন হতে পারে।
  • মৃত সন্তান প্রসব করা। যদিও এটি খুবই বিরল।

গর্ভকালীন ডায়াবেটিস নিশ্চিত হওয়া উপায়

গর্ভাবস্থার ৮ম থেকে ১২তম সপ্তাহের মধ্যে আপনার প্রথম চেকআপের সময়ে ডাক্তার আপনার গর্ভকালীন ডায়াবেটিসের ঝুঁকি আছে কি না তা বের করার জন্য আপনাকে কিছু প্রশ্ন করবেন। আপনার ক্ষেত্রে যদি এক বা একাধিক সম্ভাব্য ঝুঁকি থেকে থাকে তবে আপনাকে একটি স্ক্রিনিং পরীক্ষা করতে বলা হবে, যার মাধ্যমে আপনার গর্ভকালীন ডায়াবেটিস আছে কি না তা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে। 

এই স্ক্রিনিং পরীক্ষার নাম ওরাল গ্লুকোজ টলারেন্স টেস্ট (OGTT)। এটি সম্পন্ন করতে প্রায় ২ ঘণ্টার মত সময় লাগে। এতে প্রথমে সকালবেলা খালি পেটে আপনার রক্ত পরীক্ষা করা হবে। শর্ত হচ্ছে, রক্ত পরীক্ষার আগের ৮-১০ ঘন্টা কিছু খাওয়াবা ধূমপান করা যাবেনা। তবে পানি পান করা যেতে পারে। রক্ত পরীক্ষার পরে আপনাকে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ গ্লুকোজযুক্ত তরল পান করতে দেয়া হবে। এরপর ২ ঘন্টা বিরতির পরে আপনার শরীরে এই গ্লুকোজের জন্য কী ধরনের প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে তা আবার রক্ত পরীক্ষা করে দেখা হবে।       

সাধারণত গর্ভাবস্থার ২৪-২৮তম সপ্তাহ সময়কালে এই পরীক্ষাটি করা হয়। তবে আপনার যদি এর আগে গর্ভাকালীন ডায়াবেটিস হয়ে থাকে, তবে এবারের গর্ভাবস্থায় প্রথমবার ডাক্তার দেখানোর  সময়ই আপনাকে OGTT পরীক্ষা করানোর পরামর্শ দেয়া হবে। এই পরীক্ষার ফলাফল স্বাভাবিক আসলে পরবর্তীতে গর্ভের ২৪-২৮তম সপ্তাহকালীন সময়ে আবার পরীক্ষাটি করাতে হবে। 

গর্ভকালীন ডায়াবেটিসের চিকিৎসা কী?   

গর্ভকালীন ডায়াবেটিসের ক্ষেত্রে সম্ভাব্য জটিলতাগুলো এড়ানোর জন্য রক্তে সুগারের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখা প্রয়োজন। বাসায় রক্তের সুগার মাপার যন্ত্র বা গ্লুকোমিটার থাকলে আপনি নিজেই নিয়মিত এই মাত্রা পর্যবেক্ষণ করতে পারবেন। খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন ও শরীরকে সচল রাখার মাধ্যমে রক্তে সুগারের মাত্রা কমিয়ে আনা সম্ভব। তবে যদি এসবের পরেও রক্তে সুগারের মাত্রা না কমে, সেক্ষেত্রে চিকিৎসার জন্য ওষুধের প্রয়োজন পড়বে – ওষুধটি হতে পারে ট্যাবলেট বা ইনসুলিন ইনজেকশন। সম্ভাব্য সমস্যাগুলো এড়ানোর জন্য গর্ভাবস্থা ও প্রসবকালীন সময়ে আপনাকে নিয়মিত ডাক্তারের পর্যবেক্ষণে থাকতে হবে।

গর্ভকালীন ডায়াবেটিস থাকলে গর্ভের ৪১তম সপ্তাহের আগেই সন্তান প্রসব করা উত্তম। এ সময়ের মধ্যে প্রাকৃতিক উপায়ে বা স্বাভাবিকভাবে প্রসববেদনা না উঠলে ওষুধের মাধ্যমে বা অন্যান্য উপায়ে কৃত্রিমভাবে প্রসব প্রক্রিয়া শুরু করা হয় (induced labour) বা সিজারিয়ান পদ্ধতিতে অপারেশনের মাধ্যমে প্রসবের পরামর্শ দেয়া হয়। আপনার বা আপনার গর্ভের সন্তানের যদি কোন স্বাস্থ্যঝুঁকির সম্ভাবনা দেখা দেয়, অথবা আপনার রক্তে সুগারের মাত্রা যদি সুনিয়ন্ত্রিত না থাকে, সেক্ষেত্রে নির্ধারিত সময়েরও আগে সন্তান প্রসবের পরামর্শ দেয়া হতে পারে। 

গর্ভকালীন ডায়াবেটিসের চিকিৎসা নিয়ে এখানে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা হয়েছে। বিস্তারিত জানতে পড়ুন আমাদের এই লেখায়

গর্ভকালীন ডায়াবেটিসের দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব কী?

সাধারণত সন্তান জন্মদানের পর গর্ভকালীন ডায়াবেটিস সেরে যায়। তবে যাদের এটি একবার হয় তাদের ভবিষ্যত গর্ভধারণের ক্ষেত্রে আবারও গর্ভকালীন ডায়াবেটিস হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়, সেই সাথে মায়ের টাইপ ২ ডায়াবেটিস হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ে।

সন্তান জন্মদানের ৬ থেকে ১৩ সপ্তাহ পরে রক্ত পরীক্ষা করে দেখুন আপনার ডায়াবেটিস আছে কি না। যদি ডায়াবেটিস না থাকে, তাহলেও এরপর থেকে বছরে অন্তত একবার ডায়াবেটিস পরীক্ষা করুন। রক্তে উচ্চ মাত্রায় সুগার থাকার কোনো লক্ষণ দেখা দিলে চেকআপের জন্য অপেক্ষা না করে দ্রুত ডাক্তার দেখান।রক্তে উচ্চ মাত্রায় সুগার থাকার লক্ষণগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো: 

  • ঘন ঘন পিপাসা লাগা,
  • ঘন ঘন প্রস্রাবের বেগ হওয়া, ও 
  • মুখ শুকিয়ে যাওয়া।

আপনার কোন লক্ষণ না থাকলেও নির্ধারিত সময়মতো পরীক্ষাগুলো করাতে হবে, কারণ ডায়াবেটিসের অনেক রোগীর ক্ষেত্রেই তেমন কোন লক্ষণ দেখা দেয় না।

ডায়াবেটিস হওয়ার সম্ভাবনা কমানোর জন্য আপনার করণীয় সম্পর্কে ডাক্তার আপনাকে পরামর্শ দিবেন, যেমন স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা, সু্ষম খাবার খাওয়া এবং নিয়মিত শরীরচর্চা।

কিছু কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব মায়েদের গর্ভকালীন ডায়াবেটিস থাকে তাদের সন্তানদের পরবর্তীতে ডায়াবেটিস বা অতিরিক্ত ওজনের অধিকারী হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। 

ভবিষ্যৎ গর্ভধারণের পরিকল্পনা     

আপনার যদি আগে কখনও গর্ভকালীন ডায়াবেটিস হয়ে থাকে এবং আপনি আবারও গর্ভধারণের পরিকল্পনা করেন, তবে অবশ্যই আপনার ডায়াবেটিস পরীক্ষা করিয়ে নিন। 

যদি আপনার ডায়াবেটিস থাকে, তবে ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করে সন্তানধারণের পূর্বপ্রস্তুতি নিয়ে রাখুন। গর্ভধারণের আগে নিশ্চিত করুন যে আপনার ডায়াবেটিস পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আছে। যদি আপনি অপরিকল্পিতভাবে গর্ভধারণ করে থাকেন, তবে ডাক্তারকে জানান যে আপনার এর আগে গর্ভকালীন ডায়াবেটিস ছিল এবং সে অনুযায়ী পরামর্শ নিন। 

যদি এসময় পরীক্ষা করে দেখা যায় যে আপনার ডায়াবেটিস নেই, তবে গর্ভাবস্থার প্রথম চেকআপের সময় (গর্ভকালীন ৮ম-১২তম সপ্তাহ সময়কালে) একবার এবং ফলাফল স্বাভাবিক আসলেও ২৪তম-২৮তম সপ্তাহে আরেকবার ডায়াবেটিস পরীক্ষা করাতে বলা হবে। এর বিকল্প হিসেবে ডাক্তার আপনাকে নিজে নিজে রক্তের সুগারের মাত্রা মাপার পরামর্শ দিতে পারেন। আগের গর্ভকালীন ডায়াবেটিসের সময়ে যেভাবে গ্লুকোমিটার ব্যবহার করে ব্লাড সুগার মেপেছেন, সেভাবে এবারও মাপা চালিয়ে যেতে পারেন।


আর্টিকেলটি লেখা ও সম্পাদনায় কাজ করেছেন: সামিয়া আফরিন সেঁজুতি এবং ডা. ইমা ইসলাম।