1. পরিপাকতন্ত্রের সুস্থতা

শিশুদের ডায়রিয়া হলে করণীয়

শিশুদের ডায়রিয়া হলে করণীয়

সাধারণত জীবাণু পেটে ঢোকার কারণে শিশুদের ডায়রিয়া বা পাতলা পায়খানা হয়ে থাকে। শিশুদের ক্ষেত্রে ডায়রিয়া একটি চিন্তার কারণ। কেননা, প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় শিশুদের ডায়রিয়া থেকে সৃষ্ট পানিশূন্যতায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেশি। দ্রুত চিকিৎসা শুরু করা না হলে এই পানিশূন্যতা মারাত্মক রূপ ধারণ করতে পারে। এখানে শিশুদের ডায়রিয়া ও ডায়রিয়াজনিত পানিশূন্যতা প্রতিরোধ করার উপায় ও করণীয় নিয়ে আলোচনা করা হচ্ছে।

পড়ুন: পূর্ণ বয়স্কদের ক্ষেত্রে ডায়রিয়া বা পাতলা পায়খানা হলে করণীয়

শিশুদের ডায়রিয়ার লক্ষণ

আমরা সাধারণত ‘ডায়রিয়া’ ও ‘পাতলা পায়খানা’ শব্দ দুটি একই অর্থে ব্যবহার করি। তবে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায়, পায়খানা নরম বা পাতলা হওয়া মানেই যে ডায়রিয়া হয়েছে, বিষয়টি এমন নয়। সারাদিনে তিনবার বা তার বেশি নরম বা পাতলা পায়খানা হলে তাকেই সাধারণত ডায়রিয়া বলা হয়। 

যে শিশুরা বুকের দুধ পান করে, তাদের পায়খানা স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা নরম আর আঠালো হয়। সেটা ডায়রিয়া নয়। তবে আপনার বাচ্চার যদি স্বাভাবিকের তুলনায় ঘনঘন পাতলা পায়খানা হয় সেটাকেও ডায়রিয়া হিসেবে ধরে নেওয়া হয়।

শিশুদের পানিশূন্যতার লক্ষণ

ডায়রিয়া হলে শরীর থেকে প্রচুর পানি ও প্রয়োজনীয় বিভিন্ন লবণ বেরিয়ে যায়। যখন এই ঘাটতি পূরণ করা হয় না, তখনই পানিশূন্যতা দেখা দেয়। আর এই পানিশূন্যতা মাত্রাতিরিক্ত পর্যায়ে চলে গেলে তা থেকে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। তাই ডায়রিয়ার প্রথম চিকিৎসা হলো পানিশূন্যতা পূরণ করা। পানিশূন্যতার প্রধান লক্ষণগুলো হচ্ছে—

  • মুখ শুকিয়ে আসা
  • পিপাসা লাগা
  • চোখ শুকনো লাগা বা খচখচ করা
  • মুখ ও ঠোঁট শুকিয়ে আসা
  • গাঢ় হলুদ, তীব্র দুর্গন্ধযুক্ত প্রস্রাব হওয়া
  • প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যাওয়া (২৪ ঘণ্টায় ৪ বারের চেয়েও কম প্রস্রাব হওয়া )
  • মাথা ঘুরানো বা ঝিমঝিম করা
  • ক্লান্ত লাগা

৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে আরও কিছু লক্ষণ দেখা যায়। এসব লক্ষণ তুলনামূলকভাবে মারাত্মক, তাই শিশুকে দ্রুত ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া জরুরি।  লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে:

  • শ্বাসপ্রশ্বাস ও হৃৎস্পন্দন বেড়ে যাওয়া,
  • কান্না করলেও চোখ থেকে পানি না পড়া,
  • মাথার তালুর সামনের দিকের নরম অংশটি বসে যাওয়া, এবং
  • ঝিমিয়ে পড়া।

শিশুদের ডায়রিয়া হওয়ার কারণ

যেসব কারণে সবচেয়ে বেশি ডায়রিয়া বা পাতলা পায়খানার দেখা যায়, তার মধ্যে রয়েছে —

  • পেটে জীবাণুর আক্রমণ বা ইনফেকশন হওয়া। একে গ্যাস্ট্রোএন্টেরাইটিস ও বলা হয়। এটি বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কয়েকদিনের মাঝে সেরে ওঠে।
  • নরোভাইরাস নামের ভাইরাসের আক্রমণ।
  • ফুড পয়জোনিং বা খাদ্যে বিষক্রিয়াও পাতলা পায়খানা বা ডায়রিয়ার একটি কমন কারণ। এ নিয়ে বিস্তারিত জানতে আমাদের খাদ্যে বিষক্রিয়া সংক্রান্ত আর্টিকেলটি পড়ুন।

এছাড়াও যেসব কারণে ডায়রিয়া বা পাতলা পায়খানা হতে পারে সেগুলো হলো—

  • ঔষধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া – যে কোন ঔষধের সাথে দেওয়া নির্দেশিকা পড়ে দেখবেন ঔষধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াগুলো কী
  • নির্দিষ্ট কোন খাবারে এলার্জি বা বিশেষ কোন খাবার সহ্য না হওয়া
  • সিলিয়াক ডিজিজ
  • কোভিড-১৯

শিশুদের পাতলা পায়খানার ঘরোয়া চিকিৎসা

সাধারণত আপনি ঘরোয়াভাবেই শিশুর পাতলা পায়খানার চিকিৎসা করতে পারবেন। এক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো পানিশূণ্যতা এড়াতে প্রচুর পরিমাণে তরল পানীয় ও খাবার খাওয়া।

১. ডায়রিয়ায় শিশুদের পানিশূন্যতার চিকিৎসা

ডায়রিয়া চিকিৎসায় মূল করণীয় হলো শরীরের পানি ও লবণের ঘাটতি মেটানো। এজন্য ডায়রিয়া হলে শিশুকে পর্যাপ্ত পরিমাণে খাবার স্যালাইনের পাশাপাশি, প্রচুর পরিমাণে তরল পানীয় ও পুষ্টিকর খাবার খাওয়ানো উচিত।

প্রতিবার পাতলা পায়খানার পর ২ বছরের কম বয়সী শিশুদের ৫০-১০০ মিলি তরল পানীয় খাওয়াবেন, ২ থেকে ১০ বছর বয়সী শিশুদের ১০০-২০০ মিলি তরল পানীয় খাওয়াবেন আর ১০ বছরের বেশী বয়সী শিশুদের তরল পানীয় খাওয়াবেন যতটুকু তারা খেতে পারে।

২. বাচ্চাদের ডায়রিয়া হলে কি খাওয়া উচিত?

  • শিশুকে বুকের দুধ বা বোতলের দুধ খাওয়ানো চালিয়ে যাবেন। শিশু বমি করলে অল্প অল্প করে বারবার খাওয়াতে পারেন।
  • তরল পানীয়ের মধ্যে চিড়ার পানি, ভাতের মাড়, কিংবা ডাবের পানি খাওয়া যেতে পারে। ভাতের মাড়ে সামান্য লবণ দিতে পারেন।
  • ফর্মুলা বা শক্ত খাবার খাচ্ছে এমন শিশুদের দুই বেলা খাবারের মাঝে ছোট ছোট চুমুকে পানি খাওয়াবেন।
  • শিশুকে প্রতি তিন-চার ঘণ্টা পর পর খাওয়াবেন। একবারে অনেক বেশী খাবার না দিয়ে বার বার অল্প অল্প করে খাওয়ানো শ্রেয়।
  • শিশুদের ফর্মুলা যে পরিমাণে নির্দেশনা দেওয়া আছে, সেভাবেই বানিয়ে খাওয়াবেন। তার চেয়ে পাতলা ফর্মুলা বানিয়ে বাচ্চাকে খাওয়াবেন না।

ডায়রিয়া হলে যা খাওয়াবেন না

নির্দিষ্ট কোন খাবার দিলেই শিশুর ডায়রিয়া সেরে যাবে, এমন কথার ভিত্তি নেই। যেমন, এমন ধারণা প্রচলিত আছে যে ডায়রিয়ার রোগী সাদা ভাত আর কাঁচকলা ছাড়া আর কিছুই খেতে পারবে না। এই ধারণা টা সঠিক নয়। পাতলা পায়খানা হলেও পরিচ্ছন্ন পরিবেশে তৈরি সব ধরনের পুষ্টিকর খাবারই খাওয়া উচিত। তবে ডায়রিয়া হলে শিশুকে বাজার থেকে কেনা ফলের জুস, কোমল পানীয় ইত্যাদি খাওয়ানো থেকে বিরত থাকবেন। কারণ এসব খাওয়ানোর ফলে ডায়রিয়া আরো খারাপ হয়ে যেতে পারে।

৩. ডায়রিয়ার ঔষধ

ডায়রিয়া সাধারণত ৫-৭ দিনের মধ্যে স্বাভাবিকভাবে বন্ধ হয়ে যায়, তবে ডায়রিয়ার কারণে সৃষ্ট পানিশূন্যতার দ্রুত চিকিৎসা প্রয়োজন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বাড়িতে বসেই চিকিৎসার মাধ্যমে ডায়রিয়া থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। নিচে ডায়রিয়ার ঔষধগুলো উল্লেখ করা হলো —

১। খাবার স্যালাইন: সাধারণত প্রতিবার পাতলা পায়খানা হওয়ার পরে শিশুকে বয়স অনুপাতে উপরের পরিমাণে খাবার স্যালাইন খাওয়ানোর উপদেশ দেয়া হয়। ঘরে খাবার স্যালাইন না থাকলেও ঘরোয়া উপায়ে খাবার স্যালাইন তৈরি করে নিতে পারেন। এছাড়া চিড়ার পানি, ভাতের মাড়, কিংবা ডাবের পানিও দেওয়া যেতে পারে। ভাতের মাড়ে সামান্য লবণ দিতে পারেন। বমি ভাব হলে একটু একটু করে খাওয়ানোর চেষ্টা করবেন।

২। জিংক ট্যাবলেট: গবেষণায় দেখা গেছে, জিংক ট্যাবলেট ঔষধটি পাতলা পায়খানা হবার সময়কাল এক-চতুর্থাংশ কমিয়ে আনতে পারে। ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী শিশুকে ১০-১৪ দিনের জন্য ২০ মিলিগ্রাম করে জিংক ট্যাবলেট কিংবা সিরাপ খাওয়াতে পারেন।

৩। প্যারাসিটামল: পেটে অস্বস্তি বোধ করলে প্যারাসিটামল খাওয়া যেতে পারে। শিশুকে ঔষধ দেওয়ার আগে ঔষধের সাথে থাকা নির্দেশিকা ভালো মত পড়ে নিবেন, আর অবশ্যই বয়স অনুযায়ী সঠিক পরিমাণে ঔষধ খাওয়াতে হবে।

৪। লোপেরামাইড-জাতীয় ঔষধ: জরুরি প্রয়োজনে কয়েক ঘণ্টার জন্য পাতলা পায়খানা বন্ধ করতে ডাক্তার লোপেরামাইড-জাতীয় ঔষধ সেবনের পরামর্শ দিতে পারেন। তবে ঔষধটি কখনই ১২ বছরের কম বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা যাবে না। এতে স্বাস্থ্যের ক্ষতি হতে পারে।

ডায়রিয়ার ঔষধের সাথে বাচ্চাকে পুষ্টিকর খাবারও খাওয়াতে হবে। পুষ্টিহীনতা শিশুদের ডায়রিয়ার একটি অন্যতম কারণ, আবার ডায়রিয়ার কারণে বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান শরীর থেকে বেরিয়ে যায়। তাই ছয় মাসের কম বয়সী শিশুদের বুকের দুধ খাওয়ানো এবং বড় শিশুদের জন্য পুষ্টিকর খাবার খাওয়া চালিয়ে যেতে হবে। তবে মনে রাখতে হবে, মারাত্মক পানিশূন্যতা হলে হাসপাতালে ভর্তি করে ইনজেকশনের মাধ্যমে শিরায় স্যালাইন দিতে হতে পারে।

ডায়রিয়া হলে যেসব ঔষধ খাওয়া যাবে না

  • ১২ বছরের কম বয়সী শিশুদের ডায়রিয়া বন্ধ করার ঔষধ খাওয়া যাবে না। 
  • ১৬ বছরের কম বয়সী শিশুদের অ্যাসপিরিন আছে এমন ঔষধ দিবেন না। খেয়াল করে দেখবেন ঔষধের নামের নিচে ছোট করে ASPIRIN শব্দটি লেখা আছে কি না।
  • চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোন অ্যান্টিবায়োটিক বা দ্রুত পাতলা পায়খানা বন্ধ করার ঔষধ খাওয়াবেন না।

পরিবারে ডায়রিয়ার বিস্তার রোধে করণীয়

পাতলা পায়খানা বা ডায়রিয়া হলে রোগীর পর্যাপ্ত পরিমাণে বিশ্রাম নেওয়া প্রয়োজন। এটি একদিকে দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠতে সাহায্য করবে, অন্যদিকে ডায়রিয়া ছড়িয়ে পড়া বন্ধ করতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

ডায়রিয়া সেরে যাওয়ার পরেও কমপক্ষে দুই দিন শিশুকে বাসায় রাখবেন। বাচ্চাকে স্কুলে বা মাঠে খেলতে পাঠাবেন না। নাহলে অন্যদের মাঝেও এই পাতলা পায়খানা বা ডায়রিয়া ছড়িয়ে যেতে পারে। ডায়রিয়া বিস্তার ঠেকাতে যা করবেন—

  • বারবার সাবান ও পানি দিয়ে শিশুর হাত ধোওয়া নিশ্চিত করবেন।
  • পায়খানার সংস্পর্শে এসেছে এমন কাপড় বা বিছানার চাদর গরম পানি দিয়ে আলাদাভাবে ধুয়ে ফেলবেন।
  • পানির কল, দরজার হাতল, টয়লেট সিট, ফ্লাশের হাতল, জীবাণুর সংস্পর্শে আসতে পারে এমন জায়গা প্রতিদিন পরিষ্কার করবেন।

ডায়রিয়া হলে যা যা করবেন না

  • বাচ্চার থালা-বাসন, ছুরি-চামচ, গামছা-তোয়ালে, জামা-কাপড় কারো সাথে ভাগাভাগি করে ব্যবহার করাবেন না।
  • লক্ষণগুলো চলে যাবার পর ২ সপ্তাহ পার হওয়ার আগে পুকুর বা সুইমিং পুলে বাচ্চাকে নামাবেন না।

শিশুর ডায়রিয়ায় কখন দ্রুত ডাক্তারের কাছে যাবেন?

ডায়রিয়া হলে যদি নিচের লক্ষণগুলোর কোনটি দেখা দেয়, তাহলে দেরী না করে দ্রুত ডাক্তারের পরামর্শ নিবেন। ডায়রিয়ার গুরুতর লক্ষণগুলো হলো—

  • পায়খানার সাথে রক্ত বা আঠালো মিউকাস যাওয়া,
  • প্রচণ্ড পেটব্যথা,
  • ডায়রিয়ার অবস্থার উন্নতি না হওয়া,
  • ১২ ঘণ্টায় একবারও প্রস্রাব না হওয়া,
  • পানিশূন্যতা পূরণ না হওয়া – এর লক্ষণগুলো উপরে বলা হয়েছে,
  • ডায়রিয়ার সাথে ৪৮ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে জ্বর, অর্থাৎ শরীরের তাপমাত্রা ১০১ ডিগ্রি ফারেনহাইটের বেশি থাকা, এবং
  • শিশুর হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে আসা ও ত্বকে ছোপছোপ দাগ হওয়া।

এগুলো গুরুতর অবস্থা নির্দেশ করে, তাই ঘরোয়া চিকিৎসার সাথে দ্রুতই ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে চিকিৎসা শুরু করাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ।